হকিকতে কা’বা সম্পর্কীয় আলোচনা

হকিকতে কা'বা সম্পর্কীয় আলোচনা sufibad

খোদাপ্রাপ্তি জ্ঞানের আলোকে হযরত শাহ্সূফী খাজাবাবা ফরিদপুরী (কুঃছেঃআঃ) ছাহেবের নসিহতঃ

পবিত্র কা’বা শরীফের আর এক নাম হল “বায়তুল্লাহ” বা আল্লাহতায়ালার ঘর বা গুঞ্জায়েশ স্থল। আর হকিকতে কা’বা অর্থ আল্লাহতায়ালার গুঞ্জয়েশ স্থলের গুণগত অবস্থা। আল্লাহতায়ালার আবাসস্থল কোনটি ? আল্লাহ বলেন, “আসমান, জমিন কোথাও আমার গুঞ্জায়েশ হয় না, মু’মিন বান্দার দেল ব্যতীত।” তাহা হইলে যে মু’মিন বান্দার দেল আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশস্থল সে মু’মিন বান্দার দেল ও মক্কার কা’বার মধ্যে মিল ও পার্থক্য কি ? উহাদের হকিকতই কি ?

আল্লাহপাক পবিত্র কা’বা শরীফ সম্পর্কে বলেন,
অর্থাৎ- “যে ব্যক্তি এই ঘরে প্রবেশ করিলেন, তিনি শান্তির মধ্যে আসিলেন।”
(সূরা আলে ইমরানঃ আয়াত নং- ৯৭)

আল্লাহপাকের এই কথার নিগুঢ় অর্থ কি ?
হকিকতে কা’বার তাৎপর্য বুঝিতে হইলে এই কথার তাৎপর্য বুঝিতে হইবে। কা’বা শরীফের ইতিহাস হইতে জানা যায়, ফেরেশতাগণের জন্য যে উপাসনাস্থল বেহেশতে আছে, তাহার নাম “বায়তুল মামুর” সেই “বায়তুল মামুরের” অনুকরণে হযরত আদম (আঃ) এই ঘর তদীয় তওবা কবুলিয়াতের পরে নির্মাণ করিয়াছিলেন। হযরত আদমের (আঃ) তওবা কবুলিয়াতের স্বারক হিসেবে ফেরেশতাগণ বেহেশত হইতে “হাজরে আসওয়াদ” নামক পাথর আল্লাহতায়ালার আদেশে এই কা’বা ঘরে আনিয়া স্থাপন করেন। এই পাথর চুম্বন করিলে হযরত আদম (আঃ) এর অনুসরণের খাতিরে গোনাহ মাফ হয় বলিয়া আমরা জানি।

হযরত নূহ (আঃ) এর প্লাবনের সময় এই কা’বা ঘর মাটিতে মিশিয়া যায় । হযরত ইব্রাহিম (আঃ) পুনরায় আল্লাহতায়ালার ইশারায় এই কা’বা ঘর ও “হাজরে আসওয়াদ” আবিষ্কার ও পুনঃস্থাপন করেন।
আমরা কাবা শরীফের ইতিহাস হইতে দেখিতে পাইতেছি যে, কা’বা শরীফ ধ্বংস হইতে মুক্ত নয়। বস্তুতঃ সমস্ত সৃষ্টি বস্তুই ধ্বংস হইবে- আল্লাহতায়ালার এই বিধান হইতে কিছুই মুক্ত নয়। কিন্তু মানুষের রূহ, যাহা “আমরে রাব্বি” বা আল্লাহতায়ালার হুকুম, তাহা এই পৃথিবীর ধ্বংসের সহিত ধ্বংস হইবে না। যে কা’বা ঘর চিরস্থায়ী নয়, সেই কা’বা ঘর চিরস্থায়ী রূহকে শান্তি দান করিবে কি করিয়া ? কিন্তু মাটির পৃথিবীর ধ্বংসের সাথে সাথেই মক্কার কা’বা ঘরের বিনাশ হইবে, অতীতে ইহা ধ্বংসও হইয়াছে।

সম্প্রতি খোদ মসজিদে হারামেই বিশৃঙ্খলার খবরের কথা আমরা শুনিয়াছি। আর একবার মাত্র প্রবেশ করলেই এই কা’বা ঘরে স্থায়ী ভাবে থাকা কাহারও পক্ষে সম্ভব নহে। বস্তুতঃ মূল খানা-এ-কা’বাতে সাধারণ মানুষকে প্রবেশ করিতেও দেয়া হয় না। সাধারণ মানুষ এই ঘর তাওয়াফ করেন ও ইহার চতুঃপার্শ্বস্থ মসজিদে হেরেম শরীফে নামাজ পড়িয়া আসেন। তাহা হইলে এই ঘর যে চিরস্থায়ী শান্তি আনে বা আনিতে পারে তাহা নহে। এই ঘর যদি চিরস্থায়ী শান্তি আনিতে না পারে, তাহা হইলে আল্লাহপাক যাহা বলিলেন, “যে ব্যক্তি এই ঘরে প্রবেশ করিলেন, তিনি শান্তির মধ্যে আসিলেন।“ ইহার অর্থ কি ?

আল্লাহপাক বলিতেছেন, “তিনি শান্তির মধ্যে আসিলেন” – অর্থাৎ সেই শান্তি বিঘ্নিত হইবে না বা সেই স্থান হইতে আর ফিরিয়া আসিবার কথা নাই। কা’বা শরীফে যেমন স্থায়ী ভাবে থাকিয়া যাওয়া যায় না, সেখান হইতে সকলকেই দৈনন্দিন কাজের জন্য বাহির হইতে হয়, তেমনি ঐ ঘরে একবার প্রবেশ করিলে বা ঐ ঘর তাওয়াফ করিলে চিরস্থায়ী শান্তিতে থাকিতে পারা যায়, তাহাও নহে। কারণ বহু ব্যক্তি যাহারা ঐ ঘর তাওয়াফ করিয়াছেন, তাহারা অশান্তির মধ্যে আছেন তাহার দৃষ্টান্তও কম নয়, তাহা হইলে আল্লাহপাক যে কা’বা ঘরকে চিরস্থায়ী শান্তির প্রতীক বা শান্তির আবাস বলিতেছেন, তাহা কি ?

তাহা হইলে বুঝা যাইতেছে যে, আল্লাহপাক এই স্থানে কা’বা শরীফের বাইরের চেহারার কথা বলিতেছেন না, বলিতেছেন কা’বা শরীফের হকিকত বা তাহার নিগুঢ় গুণ সম্পর্কে। সেই গুণ কোথায় রহিয়াছে ? সেই স্থানেই হকিকতে কা’বা নিরূপিত আছে। কা’বার সহিত খোদাতায়ালার গুঞ্জায়েশ ওতপ্রোতভাবে সম্বন্ধযুক্ত কারণ কাবা- আল্লাহর ঘর বা গুঞ্জায়েশস্থল। তাই খোদাতত্ত্বজ্ঞানী কামেল আরেফগণই আল্লাহতায়ালার আবাসস্থলের গুণগত অবস্থা যাহা হকিকতে কা’বা বলিয়া বর্ণিত সে সম্পর্কে অবগত আছেন। কা’বা শরীফের সহিত ইসলামের দুইটা প্রধান রোকন নামাজ ও হজ্ব যুক্ত। হজ্ব ও নামাজের উভয়েরই চরম প্রাপ্তি আল্লাহতায়ালার দিদার। নামাজে নিহিত আছে আল্লাহতায়ালার দিদার বা মিলন। হজ্বের সময়ও কা’বাকে সাতবার প্রদক্ষিণ করিতে হয়, যাহার তাৎপর্য হইল আল্লাহতায়ালার জাতপাকের পর্দা হিসেবে যে সাতটি হকিকত নিরূপিত আছে তাহা অতিক্রম করিয়া আল্লাহতায়ালার সাক্ষাৎ লাভ। মক্কার কা’বা প্রদক্ষিণ করিলে বা তাহার চারিপার্শ্বে সাতবার তাওয়াফ করিলে হজ্বের বাহ্যিক নিয়মাবলীর একটি পালন করা হয় কিন্তু হজ্বের যে হকিকত তথা আল্লাহতায়ালার সাক্ষাৎ লাভ তাহা অর্জন করা সম্ভব হয় না। তাহা হইলে হকিকতে কা’বার নিগুঢ় অর্থ কি ?

খোদাতালাশী ব্যক্তিগণ জানেন, আল্লাহতায়ালার দর্শনের অর্থাৎ মেরাজের বা হকিকতের সালাতের ঠিক পূর্বের স্তর হল হকিকতে কা’বা অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার জাতের নিকটতম নূরের যে পর্দা বা “হেজাবুন নূর” তাহাই হকিকতে কাবা। এই হকিকতে কা’বা নামক নূরের পর্দা অতিক্রম করিয়াই হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) মহাপবিত্র মেরাজের রাত্রিতে পরম প্রভু দয়াল স্রষ্টা রাহমানুর রাহিমের জাতপাকের দর্শন লাভ করিয়াছিলেন। যিনি আল্লাহতায়ালার জাতপাকের নূরের পর্দা অতিক্রম করিতে পারিয়াছেন, আল্লাহপাকের জাতের সাক্ষাৎ “মাবুদিয়াতের সেরফার” মাকাম হইতে “ওজুদ মাওহুব লাহু”র কুওতে নজরীয়ার দ্বারা লাভ করিয়াছেন, তাহাকে আল্লাহতায়ালা তদীয় জাতপাকের পর্দার নিরাপত্তা দান করিয়া সকল গোনাহ হইতে হেফাজতের আশ্বাস প্রদান করিয়াছেন। যে রূপে তিনি আবরাহার হাত হইতে কা’বাকে রক্ষা করিয়াছেন, সেই রূপে যে দেল হকিকতে কা’বার স্তর বা আল্লাহতায়ালার জাতের নূরের পর্দার স্তর পর্যন্ত সেই মহীয়ান গরীয়ান প্রভুর দয়ায় উন্নীত হইয়াছে সেই দেলকে সকল গোনাহ ও ধ্বংস হইতে রক্ষা করেন- সেই দেলই আল্লাহতায়ালার দর্শন লাভ করিবার সম্মান লাভ করে ও সেই দেলই আল্লাহতায়ালার গুঞ্জায়েশস্থল হইয়া যায় বা হকিকতে কা’বার গুণ লাভ করে।

হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণ বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে কেবলা করিয়া সালাত বা নামাজ আদায় করিতেন। কিন্তু রাসূলে কারীম (সাঃ) ই প্রথম কা’বাকে কেবলা করিয়ার নামাজ আদায় করিবার আদেশ প্রাপ্ত হন এবং তিনি সানন্দে সেই আদেশ গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং আমরাও আমাদের নবী (সাঃ) এর অনুসরণ করিয়া এই পৃথিবীর কা’বার দিকে ফিরিয়া সেজদা করি। কিন্তু কা’বার দিকে ফিরিয়া কা’বাকে সেজদা করি না, সেজদা করি আল্লাহপাককে। নামাজের নিয়ত কা’বাতিশ শরিফাতে বলিয়া শেষ হয় না, শেষ হয় কা’বাতিশ শরিফাতে আল্লাহু আকবার বলিয়া। আবার সেজদার সময় দেলকে মোতাওয়াজ্জুহ করি আল্লাহর দিকে। সেজদাও দেই আল্লাহকে। তাহা হইলে কা’বার দিকে ফিরিয়া কেন ?
আল্লাহর কোনো সুনির্দিষ্ট দিক নাই। তিনি সর্বত্র বিরাজমান। তাহার জাত, সিফাত ও আফয়ালও সর্বত্র বিরাজমান।

গ্রন্থসূত্রঃ নসিহত- সকল খন্ড একত্রে।
খণ্ড নং- ১০, নসিহত নং- ৫৯
পৃষ্ঠা নং- ৪৯৭ ও ৪৯৮।

 

 

আরো পড়ুনঃ

 

Related posts

Leave a Comment