সৈয়দ সিরাজুল কবির – বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের প্রবীণ খাদেম

সৈয়দ সিরাজুল কবির - বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের প্রবীণ খাদেম

সৈয়দ সিরাজুল কবির – বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের প্রবীণ খাদেম

আজ কিছু কথা বলছি এমন একজনকে নিয়ে যিনি তার কর্ম দিয়ে তরীকতপন্থীদের মাঝে বেঁচে থাকবেন কেয়ামত পর্যন্ত।
তিনি সৈয়দ সিরাজুল কবীর যিনি কেবলাজান হুজুর খাজাবাবা ফরিদপুরী (কু : ছে : আ : ) ছাহেব এর মহা পবিত্র নসিয়ত শরীফের শ্রুতিলিপি কেবলাজানের পবিত্র জবান থেকে সংগ্রহ করেছেন। উল্লেখ করা প্রয়োজন একাজে তার সাথে আরো ছিলেন জনাব আক্তার হোসেন কাবুল যিনি আজও বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে খেদমতে নিয়োজিত আছেন।

আমি বেশ কিছু দিন জনাব সৈয়দ সিরাজুল কবীরের সান্নিধ্যে ছিলাম বিশেষ করে আল মুজাদ্দেদ এ কর্মরত থাকাকালীন সময়। সে সময় আমি তার যে পরিমান আদর লাভ করেছি তা মৃত্যু পর্যন্ত ভুলবার না। ঐ সময় কবীর চাচার মুখে শোনা তার জীবনের কিছু ঘটনা তুলে ধরছি।
বলে রাখা ভালো সৈয়দ সিরাজুল কবীর তার সমসাময়িক কালে এদেশের অন্যতম সেরা সাংবাদিক ছিলেন। তিনি এনা ( নিউজ এজেন্সী )র চিফ রিপোর্টার ছিলেন।

কবীর চাচা মুখে শুনেছি তিনি যখন আমেরিকা যেতেন তখন হোয়াইট হাউজ গেস্ট হাউজ এ থাকতেন, ব্রিটেন গেলে রানীর গেস্ট হাউজ সৌদি আরব গেলে বাদশার গেস্ট হাউজ এ তার থাকার ব্যবস্থা হতো। সে সময়ে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যতগুলো বিদেশ সফর করেছেন তার সব কয়টিতে কবীর চাচা প্রেসিডেন্ট এর সফরসঙ্গী ছিলেন। এ থেকে বুঝা যায় তার সে সময় ব্যাক্তিগত অবস্থাকেমন ছিলো।

কবীর চাচাকে প্রথম দরবারে নিয়ে যান সে সময়ের আর এক নামকরা সাংবাদিক কেবলাজানের মুরিদ জনাব মাহাবুবুর রহমান রুশো। কেবলাজানের সাথে প্রথম দর্শন বিষয়ে কবীর চাচা কাছে শুনেছি রুশো ভাই কেবলাজানকে বলেন হুজুর একজন বড় সাংবাদিক নিয়ে আসছি। কেবলাজান কবীর চাচার দিকে দৃষ্টিপাত করে বলেন বাবা আপনি কি রিপোর্ট করেন। উত্তরে কবীর চাচা বলেন দেশে বিদেশে যেসব ঘটনা ঘটে তার রিপোর্ট করি। কেবলাজান বলেন আপনাদের রিপোর্ট তো সব ঠিক হয় না মাঝেমাঝে ভুল ও হয়। কবীর সাহেব বললেন হুজুর ভুল তথ্য ও অনেক সময় প্রকাশ হয়। কেবলাজান বললেন বাবা আমি আপনাকে আসমানী জগতের রিপোর্টার বানাবো যার কোনো ভুল নাই। তিনি নসিয়ত শরীফ এর যে খেদমত করেছেন প্রথম দেখার দিনই কেবলাজান তার ইশারা দিয়েছেন। আসলেই তো তিনি ও কাবুল ভাই আসমানী জগতের খবর দুনিয়াবাসিকে রিপোর্ট করেছেন। কেয়ামত পর্যন্ত নসিয়ত শরীফ থাকবে সাথে জড়িয়ে থাকবে তাঁদের নাম।
আর একটি কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। জানিনা বলা ঠিক হবে কিনা।
ঘটনাটা কবীর চাচার মুখে শোনা।

তখন কবীর চাচা এনা তে কর্মরত। দেশে তখন সামরিক শাসন।জিয়াউর রহমান সামরিক শাসক। সরকারের প্রধানমন্ত্রীর পদ মর্যাদায় সিনিয়র মন্ত্রী ছিলেন মসিউর রহমান (জাদু মিয়া )। একদিন মসিউর রহমান এর বিরুদ্ধে যায় এমন একটি খবর এনা তে প্রকাশ হয়। যা ছিলো কবীর চাচার অজানা। কিন্তু যেহেতু তিনি চিফ রিপোর্টার তাই রাতে মসিউর রহমান এনা অফিসএ ফোন করেন। তখন মসিউর মাতাল অবস্থায় ছিলেন।ঐ অবস্থায় মন্ত্রী কবীর সাহেবকে কুকুরের বাচ্চা বলে গালি দিলে তরুণ বয়সের কবীর চাচাও একই গালি দিয়ে ফেলেন। মুহূর্তেই মসিউর রহমান খেপে গিয়ে বলেন তোমাকে আমি আগামী কালকেই দেখিয়ে দেবো আমি কে। একে সামরিক সরকার, তার উপরে প্রধানমন্ত্রীকে গালি কবীর চাচা ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি সেই মুহূর্তে উলন এ চলে গেলেন। তখন উলন এ কেবলাজান হুজুরের দুই আওলাদ থাকতেন। অনেক রাতে উলন এর বাড়িতে কবীর চাচাকে দারোয়ান ঢুকতে দেবে না। কারণ কেবলাজান এর নিষেধ। দারোয়ান বাবর আলী চাচাসাথে তর্কাতর্কির শব্দ পেয়ে খাজা মিয়া ভাইজান মুজাদ্দেদি ছাহেব কবীর চাচাকে ভিতরে আসতে বলেন। সব কথা শুনে খাজা মিয়াভাইজান মুজাদ্দেদি ছাহেব কবীর চাচাকে বলেন আপনি বাসায় গিয়া ঘুমান। মসিউর রহমান সাহেব কাল পর্যন্ত বাঁচলে তো দেখে নেবে।
বলা বাহুল্য ঐ রাতেই মসিউর রহমান সিভিয়ার স্টোক করেন। ও কোমায় চলে যান। মৃত্যু পর্যন্ত আর তার সেন্স আসে নাই।
কবীর চাচার মুখে এমন অনেক কথা শুনেছি যা একটি বইযে লিপিবদ্ধ করা কঠিন।

দৈনিক আল মুজাদ্দেদ এ থাকাকালীন একবার কবীর চাচার সাথে দরবারে গেলাম। কেবলাজানের সামনে যখন গেলাম কেবলাজান আল মুজাদ্দেদ এর খোঁজ খবর কবীর চাচার কাছ থেকে নিলেন। কেবলাজান কবীর চাচাকে বললেন বাবা কবীর আল মুজাদ্দেদ অফিস এ মোট স্টাফ কত। জানানো হলো ১৭০ জন। কেবলাজান কবীর চাচাকে বললেন বাবা এদের সবার প্রতিদিনের অজিফা তুমি আদায় করবা। কবীর চাচা শুধু ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালেন। আজও মনে প্রশ্ন জাগে এটা কি করে সম্ভব। কবীর চাচাকে অনেক বার জিজ্ঞাসা করেছি শুধু মুচকি হাসতেন। সে দিন সেখানে আরো একজনকে কেবলাজান আর একটি দায়ত্ব দেন।সেখানে উপস্থিত তখন আল মুজাদ্দেদএ কর্মরত মরহুম আব্দুল গফুর হাজরা (গফুর ভাই ) কে হুজুর বলেন গফুর তুমি এই ১৭০ জন কে কুয়াতের কেল্লার হেফাজতে রাখবা। জানি না তারা কি ভাবে এগুলা করে।

ঐ দিনই কেবলাজান কবীর চাচাকে নিয়ে আমাদের বলেন বাবা কবীর আমার পুত্রবৎ তাই আমি ঠিক করছি ওকে আমি দরবারে একটা বাড়ি বানিয়ে দেব। আমি বাইরে এসে কবীর চাচাকে বললাম বাড়ি পেলে আমাকে একটা রুম দেবেন। কবীর চাচা শুধু হাসলেন। মূর্খ আমি বুঝতেই পারি নাই এটা কোন বাড়ি। কবীর চাচা ঠিকই দরবার শরীফ এ বাড়ি পেয়েছেন। যে বাড়িতে এখন তিনি আরাম করছেন।

কবীর চাচা কে নিয়ে আরো অনেক কিছু লেখার ইচ্ছা ছিলো কিন্তু কিছু বিষয় লিখার সাহস হলো না পরে সময় সুযোগ পেলে লিখার চেষ্টা করবো।
কবীর চাচা মৃত্যু বরণ করেন বিদেশে। তার কফিন বনানী হুজরা শরীফে আনার পরে কফিনের
মুখ খুলে দেখলাম ক্লিন সেভ মুখ ঘুমিয়ে আছেন। সারারাত কফিন হুজরা শরীফ এ রাখা ছিলো। সকালে কফিনের মুখ খুলে দেখি কবীর চাচার মুখের দাঁড়ি খোঁচা খোঁচা। অর্থাৎ দাঁড়ি বড় হয়েছে। বিশ্ব জাকের মঞ্জিল এ দাফন করার সময় কবীর চাচাকে দাঁড়িওয়ালা লোক বলে মনে হয়েছে।
দাফন পর্ব শেষ হবার পরে তার কবরের পাশে দাড়িয়ে কবীর চাচার ওপর যুগল কাবুল ভাই ভাইজানের একটা বাণী পড়ে শুনান যার দুটি লাইন এমন, “কবীর ভাই ছিলেন সংসার ত্যাগী, দুনিয়া ত্যাগী একজন। তিনি মৃত্যু পর্যন্ত কেবলাজান ও খাজা পরিবারের খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ পর্যায়ের আশেক মুরিদ “।

একজনমে একজন মানুষের আর কি পাওয়ার আছে।
কবীর চাচার দাফনের কিছু দিন পরে খাজা মিয়া ভাইজান মুজাদ্দেদি ও খাজা মেঝো ভাইজান মুজাদ্দেদি ছাহেব বিদেশ থেকে দেশে আসেন। সে দিন খাজা মিয়া ভাইজান মুজাদ্দেদি ছাহেবের একটি কথা উল্লেখ না করে পারছি না তিনি বললেন আলাউদ্দিন দাদা (মরহুম আলাউদ্দিন চৌধুরী ) কেবলাজান কে তার হায়াত দিয়ে চলে গেছেন আর কবীর ভাই আপনাদের মেঝো ভাইজান কে তার হায়াত দিয়ে চলে গেলেন।
এদের জন্যই তরিকা, এদের জন্যই পীর।
পীর মুরিদি এদের জন্য।

লিখেছেনঃ লুৎফুল হাফিজ পলাশ

Related posts

Leave a Comment