ঢাকা ০১:৪৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

শাহসূফি খাজা ফরিদপুরীর দৈনন্দিন জীবন

  • আপডেট সময় : ০৬:১৯:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ মার্চ ২০২৪
  • / ২৪০২ বার পড়া হয়েছে

শাহসূফি খাজা ফরিদপুরীর দৈনন্দিন জীবন

Sufibad.com - সূফিবাদ.কম অনলাইনের সর্বশেষ লেখা পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

আমার মহাওলী খাজাবাবার দৈনন্দিন জীবন ছিল অত্যন্ত কর্মমুখর। সারাবছর প্রতিদিন ভোর রাত তিনটায় তিনি মাইকে জাকেরদেরকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতেন। দরবারের শান্তিময় পরিবেশে জাকেরদের চোখে গভীর ঘুম নেমে আসতো। বিভোর ঘুমে যখন সবাই নিমগ্ন থাকতো, তখন কটকট শব্দে মাইকে আওয়াজ হতো। দয়াল বাবা মধুর সুরে জাকেরদের ডাকতেন। বলতেন, “বাবারা উঠো, বাবাসকল আর ঘুমাইওনা। রহমতের সময় বয়ে যাচ্ছে, আকাশ-বাতাস পশু-পাখি আল্লাহর রহমতের উমেদার হয়ে আল্লাহকে ডাকছে। এসময় তোমরাও উঠো, তোমরাও আল্লাহকে ডাকো”। তিনি কত আদর করে, কত স্নেহের ভাষায় জাকেরদেরকে ডাকতেন, তা কর্ণ কুহরে প্রবেশ করলে কঠিন হৃদয় গলে যেতো।

“উঠো উঠো আশেকান খুলে দেখো দুনয়ন খোদার রহমত বয়ে যায়গো রইলে কেনো অচেতন”

আরও বলতেন,

”খোদার রহমতের দরিয়ায় এযে উজান বয়েছে খোদা পাবার আশা যার প্রাণ তার কেঁদেছে”

বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে বলতেন, “হে তামাম দুনিয়ার লোকসকল তোমরা আল্লাহকে ডাকো, রহমতের সময় ঘুমাইওনা, এসময় আল্লাহর ওলীরা আল্লাহকে ডাকে, তাঁদের সাথে তোমরাও আল্লাহকে ডাকো, ‘ইয়া আল্লাহু ইয়া রাহমানু ইয়া রাহিম’ -এই তিন নাম ধরে ডাকো”। একই সাথে দয়াল নবী (সাঃ) কেও ‘রাহমাতাল্লিল আলামিন’ নামে ডাকার জন্য বলতেন। তিনি নিজেও ডাকতেন আল্লাহ ও দয়াল নবী (সাঃ) কে। জাকেরদেরকেও একই ভাবে ডাকার তালিম দিতেন। কি মধুর কন্ঠ ছিল বাবার। প্রাণ জুড়ানো সেই কন্ঠ যে শুনেছে তার জন্য ভোর রাতে রহমতের সময় বিছানায় শুয়ে থাকা সম্ভব হতোনা। বাবার কণ্ঠের সাথে সুর মিলিয়ে জাকের ভাইয়েরা যখন ‘ইয়া আল্লাহু ইয়া রাহমানু ইয়া রাহিম’ বলে আল্লাহকে ডাকতে থাকতেন, তখন জাকেরদের চোখের পানিতে বুক ভেসে

যেতো। সে এক অভিনব স্বর্গীয় অনুভূতির পরশ আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে পড়তো। পাপী তাপী মানুষের আত্মিক পরিশুদ্ধির অতুলনীয় পরিবেশ সৃষ্টি হতো। রহমতের সময়ের সে অনুভূতি যে কত মধুর তা ভুক্তভোগী আত্মা ব্যতীত কেউ বুঝতে পারবেনা। এভাবে আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে ভোর হয়ে আসতো। মসজিদে আজান হতো। আজানের পর বাবা সবাইকে সাথে নিয়ে ফজরের নামাজ পরতেন। নামাজের পর সবাইকে সাথে নিয়ে ফাতেহা শরীফ পড়ানো হতো। বাবা নিজে ফাতেহা শরীফের মোনাজাত করতেন। মাঝে মাঝে অন্য মাওলানাদের মোনাজাত করতে বলতেন। মোনাজাত শেষে কোন মাওলানাকে বলতেন খতম শরীফ পড়ানোর জন্য। দরবার শরীফে রহমতের এবাদত, ফাতেহা শরীফ, খতম শরীফ, দরুদ শরীফ এসব এখনও চালু আছে বাবার নির্দেশ মোতাবেক। বাবার আশেকানবৃন্দ এখনও দেশ দেশান্তরে ঘরে ঘরে রহমতের সময় আল্লাহকে ডাকছে ‘ইয়া আল্লাহু ইয়া রাহমানু ইয়া রাহিমু’ বলে, দয়াল নবী (সাঃ) এর মহব্বতে কাঁদছে ‘ইয়া রাহমাতাল্লিল আলামিন’ বলে, আর দয়াল মুর্শিদের বিরহে চোখের পানিতে বুক ভাসাচ্ছে যিনি বিশ্ববাসীকে শিখিয়ে দিয়ে গেছেন আল্লাহ রাসুলের (সাঃ) মহব্বত সৃষ্টি করার শাশ্বত পদ্ধতি।

ফজরের নামাজ, ওজিফা শেষ হবার সাথে শেষ হয়ে যেতো রাত, শুরু হতো দিন। জাকেরান সকল যার যার মতো নাস্তা পানি শেষে দায়রা শরীফে ভীড় করতো। দয়াল বাবা ইতিমধ্যে হুজরা শরীফে এসে বসতেন। উপস্থিত জাকেরদের সুখ দুঃখের নালিশ শুনতেন। তাদেরকে প্রয়োজনীয় উপদেশ দিতেন। দরবারের প্রত্যেকটি অনুষ্ঠানে প্রচুর নতুন নতুন মানুষ ভীড় করতো। তারা বাবাজানের কাছে সত্য তরিকা গ্রহণের ইচ্ছা পোষণ করতো। বাবাজান তাদেরকে তরিকা প্রদান বা বায়াত করতেন। বায়াত করার সময় মূল্যবান উপদেশ দিতেন। এভাবে বেলা দশটা এগারটা বেজে যেতো। তখন সকলকে বলতেন, “যাও বাবা খানা খাও গিয়ে”। আমাদের দরবার শরীফের জন্ম লগ্ন থেকে দুবেলা খানা খাবার রেওয়াজ প্রচলিত আছে। প্রথমবার বেলা দশটা-এগারটার দিকে, দ্বিতীয়বার আসরের পর মাগরিবের পূর্বে। জাকেরানরা খাওয়া দাওয়া ‘সারতে সারতে দুপুর ঘনিয়ে আসতো। জোহরের আজান হতো। বাবাজান নামাজের কিছুক্ষণ পূর্বেই হুজরা শরীফে এসে তশরিফ নিতেন। তখনও জাকেরান সকল তাঁর কাছে নানা ধরনের অভাব অভিযোগ নিয়ে নালিশ করতো। বাবাজান স্নেহভরা কণ্ঠে সে সব অভাব অভিযোগের সমাধান দিতেন। জামাতে সকলের সাথে বাবাজান নামাজ আদায় করতেন। নামাজ শেষে আবার হুজরা শরীফে বসতেন। কারণ ইতিমধ্যে নতুন নতুন লোক এসে ভীড় করতো। তাদেরকে দেখা দিতেন, তাদের কথা শুনতেন, কারও প্রয়োজন থাকলে বিদায় দিতেন। বাবার অবসর কখনো ছিলনা।

জাকেরদের নালিশ শুনার ফাঁকে ফাঁকে তিনি দরবার শরীফের দৈনন্দিন কাজের নির্দেশ দিতেন। প্রতিদিনের রান্না, তরকারি-কতটুকু হবে, কি হবে, তাও নির্দেশ দিতেন পাকশালার খাদেমদেরকে ডেকে। কখনও নিজে চলে যেতেন পাকশালায়, গিয়ে দেখতেন ভাত-তরকারী ঠিকমত রান্না হয়েছে কিনা, জাকেরদের খাবারের কোন অসুবিধা হয় কিনা, বাবা সকলের খাবার দাবার নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। বাবাকে কখনও আমরা খেতে দেখিনি। কি খেতেন, কি পছন্দ করতেন-তা আমাদের কাছে চিরদিন অজ্ঞাতই রয়ে গেলো। কোনদিন শুনিনি এটা চাই ওটা চাই। সম্পূর্ণ আল্লাহ নির্ভর দয়াল মুর্শিদ কখনইবা বিশ্রাম নিতেন কখনইবা কিছু খেতেন তা আমাদের চিন্তায় আসেনা। কারণ সারাদিনই জাকেরদেরকে নিয়ে, জাকেরদের সুখ-দুঃখ নিয়েই বাবা ব্যস্ত থাকতেন। বিকেলেও বাবা আগত জাকেরদের নালিশ শুনতেন। আসরের নামাজ শেষে কিছুক্ষণ হুজরা শরীফে বসে জাকেরদেরকে সাক্ষাত দিয়ে সারা দরবার শরীফের গোশালা, পাকশালা, মসজিদ মাদ্রাসা, ছাগলশালা, মুরগীশালা, বিভিন্ন স্থান ঘুরে ঘুরে দেখতেন। মাগরিবের পূর্বে জাকেরদের খাবার মাঠের সামনে গিয়ে তশরিফ নিতেন। আমরা দল বেধে বাবার চারদিকে বসতাম ভাতের বাসন নিয়ে। বাবা চারিদিকে তাঁকিয়ে আমাদের খাওয়া তদারকি করতেন। বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন ফল-ফলাদি পরিবেশনের জন্য খাদেমদেরকে নির্দেশ দিতেন। যেমন-আম কাঁঠালের দিনে আম, কাঁঠাল, দুধ এসব খেতে দেয়া হতো সাধারন খাবারের অতিরিক্ত। কখনও কখনও গোস্ত দিয়ে খিচুরী, কখনও খিচুরী ও ঝোল গোস্তের তরকারী। মোটকথা জাকেরদের মনে যেনো কোন আফসোস না থাকে যে দরবারে এসে এটা খেলামনা ওটা পেলামনা – তা মনে করার উপায় ছিলনা। বাবা আমাদেরকে বিভিন্ন মওসুমের পিঠাও খাইয়েছেন কতনা আদর করে। কিন্তু নিজে কোনদিন এক চিমটিও মুখে দেননি। মাগরিবের নামাজ শেষে বাবা আবার হুজরা শরীফে বসতেন, একেবারে এশা পর্যন্ত জাকেরদের নানা প্রকার নালিশ শুনতেন। দূর দুরান্ত থেকে জাকের ভাইয়েরা নানা সমস্যা নিয়ে বাবার কাছে আসতো। এসে নালিশ করার সাথে সাথে এমন সুন্দর একটা সমাধান দিয়ে দিতেন, তাতে একটু আগে যে লোকটার চিন্তায় মুখখানা কালিমা মাখা ছিল বাবার সাথে কথা বলার পর পরই তার মুখ হাস্যোজ্জল হয়ে যেতো। মনে হতো তার মত সুখী বোধহয় আর কেউ নেই। তাছাড়া বাবার বিশেষ গুণ ছিল যত বিপদগ্রস্থ লোকই তাঁর কাছে আসতো, বাবা শান্তনা দিয়ে বলতেন, “বাবা অসীম দয়ালু আল্লাহ ইচ্ছা করলে কিনা হয়। আল্লাহকে ডাক, ভয় নেই বাবা। তোমার দাদাপীর তোমার পিছনে আছেন”। বাবাজান জীবনে কোন কথা নিজের উপর ভরসা করে বলেননি। সব সময়ই বলতেন তোমার দাদাপীরের খাতিরে আল্লাহ দয়া করছেন বা করবেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় বাদ দিয়ে

সারাদিন জাকেরদের নালিশ শোনা, বিশাল দরবারের শত শত জাকেরদের খাওয়া দাওয়া, বিভিন্ন দফতরের কাজকর্ম দেখা-শোনা করা, এসব শেষ হতে হতে রাত বারটাও বেজে যেতো। এশার নামাজের পর পাঁচশত বার দরুদ শরীফ পড়ানো হতো, এখনো পড়ানো হয়। দেখা যেতো রাত একটা-দুটা বা আরও গভীর রাতে কোন জাকের দরবারে এসে হাজির। সবাই ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু দেখা যেতো দরবারে পৌঁছার সাথে সাথে বাবা জানালা খুলে জিজ্ঞাসা করছেন, “কে বাবা, এত রাত হলো কেনো বাবা। পথে কষ্ট হয়নিতো বাবা?”। যত কষ্ট করেই আসা হোক না কেনো যার উদ্দেশ্যে যাওয়া, সেই দয়াল পীর কেবলাজানের কণ্ঠ থেকে এধরনের মধুময় উক্তি যখন সেই জাকেরের কানে প্রবেশ করতো তারপর কি আর তার শরীরের ক্লান্তি থাকে? অত্র নরাধমের জীবনে এধরনের বহু অভিজ্ঞতা রয়েছে। পথে কত কষ্ট করে গভীর রাতে দরবারে গিয়ে পৌছেছি। পৌছার সাথে সাথেই দয়াল বাবার মধুময় কন্ঠের ‘বাবা’ ডাক শুনে সমস্ত ক্লান্তি ও যন্ত্রনা ভুলে গেছি। মনে হয়েছে একটু পূর্বে যে কষ্টকর ভ্রমনটা হয়েছে তা ছিল স্বপ্ন। বাস্তব এটাই বাবার দরবারে এসেছি। স্বর্গের সুখের অনুভুতি আমাদের জানা নেই, তবে বাবার সান্নিধ্যে যে সুখ আমরা পেয়েছি জাগতিক কোন আনন্দ বা সুখ তার কাছে কিছুই নয়। আমরা বাবার সান্নিধ্যে স্বর্গসুখ লাভ করেছি। আমাদের চিন্তায় বাবা পেটে আহার দিতেন না, আমাদের মঙ্গল কামনায় নিদ্রা

যেতে পারতেন না। তিনি বলতেন, “তোমরা কে ক্ষুধায় কষ্ট করছো, কে রোগে পড়ে আছো, কে কোন বিপদে আছো, আমার কাছে নালিশ করে যাও তাই তোমাদের চিন্তায় আমার ঘুম আসেনা”। এই মহান দরদী বান্ধব আমাদের জন্য চিন্তা করতে করতে অস্থি-চর্মসার হয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের মঙ্গলের জন্য দিনরাত আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে গেছেন। আজ যে বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের নাম সারা বিশ্ব জুড়ে প্রচারিত তা তিনি তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন। যেখানে এক সময় মুসলমানরা জুমার নামাজ পড়তে পারতোনা, আজান হতোনা, ঈদের জামাত করতে পারতোনা, গরু কোরবানী করতে পারতোনা আজ সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইসলাম চর্চা ও সম্প্রচারের প্রাণকেন্দ্র। বিশ্ব জাকের মঞ্জিল জামে মসজিদ উপমহাদেশের অন্যতম জামে মসজিদ, বিশ্বজাকের মঞ্জিল আলিয়া মাদ্রাসা, বিশ্ব জাকের মঞ্জিল হাসপাতাল, ব্যাংক, পোষ্ট অফিস, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, উন্নত রাস্তাঘাট সব মিলিয়ে এক কালের অজ পাড়াগাঁ এখন একটি আধুনিক শহরে রুপান্তরিত হয়েছে মহাওলী খাজাবাবার পদস্পর্শে। এই মহাওলীর দফতরের আমরা মুরিদ এটাই আমাদের গর্ব। আল্লাহর দরবারে লাখো শুকরিয়া যে তিনি আমাদেরকে এ মহাওলীর দফতরে যাবার তৌফিক দান করেছেন।

 

আরো পড়ুনঃ 

ব্লগটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

Discover more from Sufibad.Com - সূফীবাদ.কম

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

শাহসূফি খাজা ফরিদপুরীর দৈনন্দিন জীবন

আপডেট সময় : ০৬:১৯:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ মার্চ ২০২৪

আমার মহাওলী খাজাবাবার দৈনন্দিন জীবন ছিল অত্যন্ত কর্মমুখর। সারাবছর প্রতিদিন ভোর রাত তিনটায় তিনি মাইকে জাকেরদেরকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতেন। দরবারের শান্তিময় পরিবেশে জাকেরদের চোখে গভীর ঘুম নেমে আসতো। বিভোর ঘুমে যখন সবাই নিমগ্ন থাকতো, তখন কটকট শব্দে মাইকে আওয়াজ হতো। দয়াল বাবা মধুর সুরে জাকেরদের ডাকতেন। বলতেন, “বাবারা উঠো, বাবাসকল আর ঘুমাইওনা। রহমতের সময় বয়ে যাচ্ছে, আকাশ-বাতাস পশু-পাখি আল্লাহর রহমতের উমেদার হয়ে আল্লাহকে ডাকছে। এসময় তোমরাও উঠো, তোমরাও আল্লাহকে ডাকো”। তিনি কত আদর করে, কত স্নেহের ভাষায় জাকেরদেরকে ডাকতেন, তা কর্ণ কুহরে প্রবেশ করলে কঠিন হৃদয় গলে যেতো।

“উঠো উঠো আশেকান খুলে দেখো দুনয়ন খোদার রহমত বয়ে যায়গো রইলে কেনো অচেতন”

আরও বলতেন,

”খোদার রহমতের দরিয়ায় এযে উজান বয়েছে খোদা পাবার আশা যার প্রাণ তার কেঁদেছে”

বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে বলতেন, “হে তামাম দুনিয়ার লোকসকল তোমরা আল্লাহকে ডাকো, রহমতের সময় ঘুমাইওনা, এসময় আল্লাহর ওলীরা আল্লাহকে ডাকে, তাঁদের সাথে তোমরাও আল্লাহকে ডাকো, ‘ইয়া আল্লাহু ইয়া রাহমানু ইয়া রাহিম’ -এই তিন নাম ধরে ডাকো”। একই সাথে দয়াল নবী (সাঃ) কেও ‘রাহমাতাল্লিল আলামিন’ নামে ডাকার জন্য বলতেন। তিনি নিজেও ডাকতেন আল্লাহ ও দয়াল নবী (সাঃ) কে। জাকেরদেরকেও একই ভাবে ডাকার তালিম দিতেন। কি মধুর কন্ঠ ছিল বাবার। প্রাণ জুড়ানো সেই কন্ঠ যে শুনেছে তার জন্য ভোর রাতে রহমতের সময় বিছানায় শুয়ে থাকা সম্ভব হতোনা। বাবার কণ্ঠের সাথে সুর মিলিয়ে জাকের ভাইয়েরা যখন ‘ইয়া আল্লাহু ইয়া রাহমানু ইয়া রাহিম’ বলে আল্লাহকে ডাকতে থাকতেন, তখন জাকেরদের চোখের পানিতে বুক ভেসে

যেতো। সে এক অভিনব স্বর্গীয় অনুভূতির পরশ আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে পড়তো। পাপী তাপী মানুষের আত্মিক পরিশুদ্ধির অতুলনীয় পরিবেশ সৃষ্টি হতো। রহমতের সময়ের সে অনুভূতি যে কত মধুর তা ভুক্তভোগী আত্মা ব্যতীত কেউ বুঝতে পারবেনা। এভাবে আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে ভোর হয়ে আসতো। মসজিদে আজান হতো। আজানের পর বাবা সবাইকে সাথে নিয়ে ফজরের নামাজ পরতেন। নামাজের পর সবাইকে সাথে নিয়ে ফাতেহা শরীফ পড়ানো হতো। বাবা নিজে ফাতেহা শরীফের মোনাজাত করতেন। মাঝে মাঝে অন্য মাওলানাদের মোনাজাত করতে বলতেন। মোনাজাত শেষে কোন মাওলানাকে বলতেন খতম শরীফ পড়ানোর জন্য। দরবার শরীফে রহমতের এবাদত, ফাতেহা শরীফ, খতম শরীফ, দরুদ শরীফ এসব এখনও চালু আছে বাবার নির্দেশ মোতাবেক। বাবার আশেকানবৃন্দ এখনও দেশ দেশান্তরে ঘরে ঘরে রহমতের সময় আল্লাহকে ডাকছে ‘ইয়া আল্লাহু ইয়া রাহমানু ইয়া রাহিমু’ বলে, দয়াল নবী (সাঃ) এর মহব্বতে কাঁদছে ‘ইয়া রাহমাতাল্লিল আলামিন’ বলে, আর দয়াল মুর্শিদের বিরহে চোখের পানিতে বুক ভাসাচ্ছে যিনি বিশ্ববাসীকে শিখিয়ে দিয়ে গেছেন আল্লাহ রাসুলের (সাঃ) মহব্বত সৃষ্টি করার শাশ্বত পদ্ধতি।

ফজরের নামাজ, ওজিফা শেষ হবার সাথে শেষ হয়ে যেতো রাত, শুরু হতো দিন। জাকেরান সকল যার যার মতো নাস্তা পানি শেষে দায়রা শরীফে ভীড় করতো। দয়াল বাবা ইতিমধ্যে হুজরা শরীফে এসে বসতেন। উপস্থিত জাকেরদের সুখ দুঃখের নালিশ শুনতেন। তাদেরকে প্রয়োজনীয় উপদেশ দিতেন। দরবারের প্রত্যেকটি অনুষ্ঠানে প্রচুর নতুন নতুন মানুষ ভীড় করতো। তারা বাবাজানের কাছে সত্য তরিকা গ্রহণের ইচ্ছা পোষণ করতো। বাবাজান তাদেরকে তরিকা প্রদান বা বায়াত করতেন। বায়াত করার সময় মূল্যবান উপদেশ দিতেন। এভাবে বেলা দশটা এগারটা বেজে যেতো। তখন সকলকে বলতেন, “যাও বাবা খানা খাও গিয়ে”। আমাদের দরবার শরীফের জন্ম লগ্ন থেকে দুবেলা খানা খাবার রেওয়াজ প্রচলিত আছে। প্রথমবার বেলা দশটা-এগারটার দিকে, দ্বিতীয়বার আসরের পর মাগরিবের পূর্বে। জাকেরানরা খাওয়া দাওয়া ‘সারতে সারতে দুপুর ঘনিয়ে আসতো। জোহরের আজান হতো। বাবাজান নামাজের কিছুক্ষণ পূর্বেই হুজরা শরীফে এসে তশরিফ নিতেন। তখনও জাকেরান সকল তাঁর কাছে নানা ধরনের অভাব অভিযোগ নিয়ে নালিশ করতো। বাবাজান স্নেহভরা কণ্ঠে সে সব অভাব অভিযোগের সমাধান দিতেন। জামাতে সকলের সাথে বাবাজান নামাজ আদায় করতেন। নামাজ শেষে আবার হুজরা শরীফে বসতেন। কারণ ইতিমধ্যে নতুন নতুন লোক এসে ভীড় করতো। তাদেরকে দেখা দিতেন, তাদের কথা শুনতেন, কারও প্রয়োজন থাকলে বিদায় দিতেন। বাবার অবসর কখনো ছিলনা।

জাকেরদের নালিশ শুনার ফাঁকে ফাঁকে তিনি দরবার শরীফের দৈনন্দিন কাজের নির্দেশ দিতেন। প্রতিদিনের রান্না, তরকারি-কতটুকু হবে, কি হবে, তাও নির্দেশ দিতেন পাকশালার খাদেমদেরকে ডেকে। কখনও নিজে চলে যেতেন পাকশালায়, গিয়ে দেখতেন ভাত-তরকারী ঠিকমত রান্না হয়েছে কিনা, জাকেরদের খাবারের কোন অসুবিধা হয় কিনা, বাবা সকলের খাবার দাবার নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। বাবাকে কখনও আমরা খেতে দেখিনি। কি খেতেন, কি পছন্দ করতেন-তা আমাদের কাছে চিরদিন অজ্ঞাতই রয়ে গেলো। কোনদিন শুনিনি এটা চাই ওটা চাই। সম্পূর্ণ আল্লাহ নির্ভর দয়াল মুর্শিদ কখনইবা বিশ্রাম নিতেন কখনইবা কিছু খেতেন তা আমাদের চিন্তায় আসেনা। কারণ সারাদিনই জাকেরদেরকে নিয়ে, জাকেরদের সুখ-দুঃখ নিয়েই বাবা ব্যস্ত থাকতেন। বিকেলেও বাবা আগত জাকেরদের নালিশ শুনতেন। আসরের নামাজ শেষে কিছুক্ষণ হুজরা শরীফে বসে জাকেরদেরকে সাক্ষাত দিয়ে সারা দরবার শরীফের গোশালা, পাকশালা, মসজিদ মাদ্রাসা, ছাগলশালা, মুরগীশালা, বিভিন্ন স্থান ঘুরে ঘুরে দেখতেন। মাগরিবের পূর্বে জাকেরদের খাবার মাঠের সামনে গিয়ে তশরিফ নিতেন। আমরা দল বেধে বাবার চারদিকে বসতাম ভাতের বাসন নিয়ে। বাবা চারিদিকে তাঁকিয়ে আমাদের খাওয়া তদারকি করতেন। বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন ফল-ফলাদি পরিবেশনের জন্য খাদেমদেরকে নির্দেশ দিতেন। যেমন-আম কাঁঠালের দিনে আম, কাঁঠাল, দুধ এসব খেতে দেয়া হতো সাধারন খাবারের অতিরিক্ত। কখনও কখনও গোস্ত দিয়ে খিচুরী, কখনও খিচুরী ও ঝোল গোস্তের তরকারী। মোটকথা জাকেরদের মনে যেনো কোন আফসোস না থাকে যে দরবারে এসে এটা খেলামনা ওটা পেলামনা – তা মনে করার উপায় ছিলনা। বাবা আমাদেরকে বিভিন্ন মওসুমের পিঠাও খাইয়েছেন কতনা আদর করে। কিন্তু নিজে কোনদিন এক চিমটিও মুখে দেননি। মাগরিবের নামাজ শেষে বাবা আবার হুজরা শরীফে বসতেন, একেবারে এশা পর্যন্ত জাকেরদের নানা প্রকার নালিশ শুনতেন। দূর দুরান্ত থেকে জাকের ভাইয়েরা নানা সমস্যা নিয়ে বাবার কাছে আসতো। এসে নালিশ করার সাথে সাথে এমন সুন্দর একটা সমাধান দিয়ে দিতেন, তাতে একটু আগে যে লোকটার চিন্তায় মুখখানা কালিমা মাখা ছিল বাবার সাথে কথা বলার পর পরই তার মুখ হাস্যোজ্জল হয়ে যেতো। মনে হতো তার মত সুখী বোধহয় আর কেউ নেই। তাছাড়া বাবার বিশেষ গুণ ছিল যত বিপদগ্রস্থ লোকই তাঁর কাছে আসতো, বাবা শান্তনা দিয়ে বলতেন, “বাবা অসীম দয়ালু আল্লাহ ইচ্ছা করলে কিনা হয়। আল্লাহকে ডাক, ভয় নেই বাবা। তোমার দাদাপীর তোমার পিছনে আছেন”। বাবাজান জীবনে কোন কথা নিজের উপর ভরসা করে বলেননি। সব সময়ই বলতেন তোমার দাদাপীরের খাতিরে আল্লাহ দয়া করছেন বা করবেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় বাদ দিয়ে

সারাদিন জাকেরদের নালিশ শোনা, বিশাল দরবারের শত শত জাকেরদের খাওয়া দাওয়া, বিভিন্ন দফতরের কাজকর্ম দেখা-শোনা করা, এসব শেষ হতে হতে রাত বারটাও বেজে যেতো। এশার নামাজের পর পাঁচশত বার দরুদ শরীফ পড়ানো হতো, এখনো পড়ানো হয়। দেখা যেতো রাত একটা-দুটা বা আরও গভীর রাতে কোন জাকের দরবারে এসে হাজির। সবাই ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু দেখা যেতো দরবারে পৌঁছার সাথে সাথে বাবা জানালা খুলে জিজ্ঞাসা করছেন, “কে বাবা, এত রাত হলো কেনো বাবা। পথে কষ্ট হয়নিতো বাবা?”। যত কষ্ট করেই আসা হোক না কেনো যার উদ্দেশ্যে যাওয়া, সেই দয়াল পীর কেবলাজানের কণ্ঠ থেকে এধরনের মধুময় উক্তি যখন সেই জাকেরের কানে প্রবেশ করতো তারপর কি আর তার শরীরের ক্লান্তি থাকে? অত্র নরাধমের জীবনে এধরনের বহু অভিজ্ঞতা রয়েছে। পথে কত কষ্ট করে গভীর রাতে দরবারে গিয়ে পৌছেছি। পৌছার সাথে সাথেই দয়াল বাবার মধুময় কন্ঠের ‘বাবা’ ডাক শুনে সমস্ত ক্লান্তি ও যন্ত্রনা ভুলে গেছি। মনে হয়েছে একটু পূর্বে যে কষ্টকর ভ্রমনটা হয়েছে তা ছিল স্বপ্ন। বাস্তব এটাই বাবার দরবারে এসেছি। স্বর্গের সুখের অনুভুতি আমাদের জানা নেই, তবে বাবার সান্নিধ্যে যে সুখ আমরা পেয়েছি জাগতিক কোন আনন্দ বা সুখ তার কাছে কিছুই নয়। আমরা বাবার সান্নিধ্যে স্বর্গসুখ লাভ করেছি। আমাদের চিন্তায় বাবা পেটে আহার দিতেন না, আমাদের মঙ্গল কামনায় নিদ্রা

যেতে পারতেন না। তিনি বলতেন, “তোমরা কে ক্ষুধায় কষ্ট করছো, কে রোগে পড়ে আছো, কে কোন বিপদে আছো, আমার কাছে নালিশ করে যাও তাই তোমাদের চিন্তায় আমার ঘুম আসেনা”। এই মহান দরদী বান্ধব আমাদের জন্য চিন্তা করতে করতে অস্থি-চর্মসার হয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের মঙ্গলের জন্য দিনরাত আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে গেছেন। আজ যে বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের নাম সারা বিশ্ব জুড়ে প্রচারিত তা তিনি তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন। যেখানে এক সময় মুসলমানরা জুমার নামাজ পড়তে পারতোনা, আজান হতোনা, ঈদের জামাত করতে পারতোনা, গরু কোরবানী করতে পারতোনা আজ সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইসলাম চর্চা ও সম্প্রচারের প্রাণকেন্দ্র। বিশ্ব জাকের মঞ্জিল জামে মসজিদ উপমহাদেশের অন্যতম জামে মসজিদ, বিশ্বজাকের মঞ্জিল আলিয়া মাদ্রাসা, বিশ্ব জাকের মঞ্জিল হাসপাতাল, ব্যাংক, পোষ্ট অফিস, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, উন্নত রাস্তাঘাট সব মিলিয়ে এক কালের অজ পাড়াগাঁ এখন একটি আধুনিক শহরে রুপান্তরিত হয়েছে মহাওলী খাজাবাবার পদস্পর্শে। এই মহাওলীর দফতরের আমরা মুরিদ এটাই আমাদের গর্ব। আল্লাহর দরবারে লাখো শুকরিয়া যে তিনি আমাদেরকে এ মহাওলীর দফতরে যাবার তৌফিক দান করেছেন।

 

আরো পড়ুনঃ