আব্দুল কাদের জিলানী (রঃ) এর গুনিয়াতুত তালেবীন বইয়ের সারসংক্ষেপ
ইসলাম ধর্মের ওয়াজিব ও ফরজসমূহ
- আপডেট সময় : ০৭:৪৪:৪৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩ জানুয়ারী ২০২৬
- / ২৪৭৮ বার পড়া হয়েছে
[ঈমান, নামায, যাকাত, ছদকায়ে ফিতর, রোযা, ই’তেকাফ, হজ্জ্ব ও উমরা]
ইসলামে ফরজ ও ওয়াজিব কার্য বহুত আছে। এই অধ্যায়ে আমরা ঈমান, নামায, যাকাত, ছদকায়ে ফিতর, রোযা, ই’তেকাফ, হজ্ব এবং উমরা সম্পর্কে আলোচনা করিব।
ঈমান
ইসলাম গ্রহণকারীর সর্বপ্রথম ওয়াজিব হইল কালিমায়ে তাউহীদ-
لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللهِ*
(লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহি) যবানে উচ্চারণ করা। ইসলাম ব্যতীত অন্য যে কোন ধর্মের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা, উহার সহিত মনের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা এবং অন্তরে তাউহীদবাদ অর্থাৎ আল্লাহ পাকের একত্ববাদের প্রতি দৃঢ় আস্থা পোষণ করা। এই আস্থা এবং দৃঢ় বিশ্বাসের বিস্তারিত বিবরণ পরে যথাস্থানে উল্লেখ করা হইবে।
দ্বীন ইসলাম: আল্লাহর নিকট একমাত্র সত্য এবং খাঁটি দ্বীন (ধর্ম) হইল ইসলাম। যেমন পবিত্র কোরআনে খোদ আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করিয়াছেন: “ইন্নাদ্দ্বীনা ইন্দাল্লাহিল ইসলাম।’ অর্থাৎ নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট ইসলামই হইল একমাত্র সত্য এবং মনোনীত ধর্ম। তারপর আল্লাহ তায়ালা আরও ঘোষণা করিয়াছেনঃ যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন ধর্ম পছন্দ করে, তাহা গৃহীত হইবে না।
নও মুসলিমের হকু-হকুক: যে ব্যক্তি খাঁটি দিলে কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করতঃ ইসলাম ধর্মে প্রবেশ করিল, তাহাকে হত্যা করা, তাহার সন্তান-সন্ততিকে বন্দী করা, তাহার ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করা (সমস্ত মুসলমানের উপর) হারাম (নিষিদ্ধ) হইয়া গেল। ইসলাম গ্রহণ করার পূর্বে সে যে গুনাহসমূহ করিয়াছে, তাহা সমস্তই আল্লাহ তায়ালা মাফ করিয়া দিবেন। যেমন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করিয়াছেনঃ (হে নবী!) আপনি কাফিরদিগকে জানাইয়া দিন যে, তাহারা যদি কুফরী হইতে ফিরিয়া আসে, তবে তাহার পূর্ববর্তী সমস্ত গুনাহ মাফ করিয়া দেওয়া হইবে। হুযুরে পাক (দঃ) বলিয়াছেন যে, আমাকে আদেশ করা হইয়াছে, আমি যেন মানুষের বিরুদ্ধে তখন পর্যন্ত সংগ্রামে লিপ্ত থাকি, যখন পর্যন্ত তাহারা কালিমা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু” পাঠ না করে। যখন তাহারা কালিমায়ে তাউহীদ পাঠ করিল, তখন তাহারা নিজেদের জান ও মালকে আমার নিকট হইতে নিরাপদ করিল।
হুযুরে পাক (দঃ) আরও এরশাদ করিয়াছেন যে, ইসলাম মানুষের ইসলাম-পূর্ব জীবনের গুনাহসমূহকে ধ্বংস করিয়া দেয়।
নও-মুসলিমের গোসল: নব-দীক্ষিত মুসলমানের জন্য তৎক্ষণাত গোসলে ইসলাম ওয়াজিব হইয়া যায়। এক রেওয়ায়েতে রহিয়াছে, হযরত রাসুলে করীম (দঃ) শামামাহ ইবনে আছাল এবং কায়েস ইবনে আছামের ইসলাম গ্রহণ কালে তাহাদেরকে হুকুম দিলেন, তোমরা গোসল কর। আর এক রেওয়ায়েতে আছে, হুযুরে পাক (দঃ) এরশাদ করিয়াছেন যে, নিজ দেহ হইতে কুফরীর চুলসমূহ ফেলিয়া দিয়া গোসল কর। (অর্থাৎ তোমরা কাফির থাকা অবস্থায় মাথায় যে চুল বাড়িয়াছে, তাহা মুণ্ডন করতঃ গোসল কর।
আরো পড়ুন: রুমির দর্শনে স্রষ্টার প্রেম: ২৫টি বাণী যা আপনার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে
নামায
ইসলামে দীক্ষিত ব্যক্তির উপর নামায আদায় করা ওয়াজিব হইয়া যায়। কেননা ইসলাম কথা ও কাজ দুইটিরই নাম। মুখের স্বীকৃতির প্রমাণ হইল আমল। ইহা ছাড়া অন্য প্রকারে বলা যায়, কথা হইল বাহ্যিক রূপ বা দেহ, আর আমল তাহার রূহ।
নামাযের শর্তাবলী: নামাযের কতগুলি শর্ত রহিয়াছে। সেগুলি নামাযের পূর্বেই পুরা করা জরুরী। শর্তগুলি এইঃ (১) পাক পানির দ্বারা ধুইয়া সারা শরীর পবিত্র করা (অর্থাৎ গোসল বা অজু করা)।
পানির অভাবে তাইয়াম্মুম করা (২) পবিত্র পোশাক দ্বারা সতর আবৃত করা (৩) পাক জায়গায় দাঁড়াইয়া নামায আদায় করা (৪) নামায আদায়ের জন্য কিবলামুখী হওয়া (৫) যথা ওয়াক্তে নামায আদায় করা (৬) নামায আদায়ের নিয়ত করা। (দেহের) পাক-পবিত্রতা অর্জনের রীতি-নীতির মধ্যে কতগুলি ফরজ এবং কতগুলি সুন্নত।
পবিত্রতা অর্জন তথা অজুর মধ্যে দশটি বিধান ফরজঃ (১) নিয়ত করা অর্থাৎ নাপাকী দূর করিবার জন্য নিয়ত করিতে হইবে। আর তাইয়াম্মুম করিবার কালে নামায জায়েয হওয়ার নিয়ত করিবে। তাইয়াম্মুম দ্বারা হদছ ও নাপাকী দূরীভূত হয় না।
হযরত বড় পীর (রহঃ) সাহেব যেহেতু হাম্বলী মাযহাব অনুসারী ব্যক্তি ছিলেন, তাই তিনি উক্ত মাযহাবের এই মাসয়ালাটি লিখিয়াছেন। হযরত আবূ হানীফা (রহঃ) এর মতানুযায়ী তাইয়াম্মুম দ্বারা হদছ ও নাপাকী উভয় দূর হইয়া যায় (২) অজু বা গোসল শুরু করিবার পূর্বে ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠ করা (৩) কুলি করা (৪) নাকে পানি দেওয়া; নাকের উভয় গহ্বরে পানি পৌঁছাইয়া ভিতর পরিষ্কার করা (৫) সমগ্র মুখমণ্ডল ধৌত করা (অর্থাৎ লালাটের উপরিভাগে চুল উদ্গত হইবার স্থান হইতে দুই কানের লতি এবং নীচে থুতনী পর্যন্ত এবং এইভাবে দাড়ির প্রত্যেকটি চুলের গোড়া পর্যন্ত পানি পৌছাইয়া দিবে। (৬) উভয় হাত কনুই পর্যন্ত ধৌত করা (৭) মস্তক মাসেহ করা। মাসেহর নিয়ম হইল: উভয় হাত পানিতে ভিজাইয়া উহা মাথার অগ্রভাগ হইতে পিছনের দিকে গরদান পর্যন্ত লইয়া যাইবে। আবার সেখান হইতে উভয় হাত টানিয়া সেখানে আনিবে, যেখান হইতে মাসেহ শুরু করিয়াছিল। আর এ সময় উভয় হাতের দুইটি অঙ্গুলি দুইটি কানের ছিদ্র মধ্যে প্রবেশ করাইবে। অতঃপর অঙ্গুলিদ্বয় বাহির করতঃ উহার দ্বারা দুই কানের উপরি ভাগ মাসেহ করিবে। (৮) উভয় পা টাখনু পর্যন্ত ধৌত করিবে।
উল্লিখিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধৌত কাজগুলি একই সঙ্গে একটির পর একটি সম্পন্ন করা ওয়াজিব। (৯) অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধৌতকালীন পূর্বাপর তারতীব অর্থাৎ ধারাবাহিকতা রক্ষা করিতে হইবে। হযরত বড় পীর (রহঃ) সাহেব হাম্বলী মাযহাব অনুসারে ইহাকে ফরজ বলিলেও হযরত আবূ হানিফা (রহঃ) এর নিকট
‘ইহা সুন্নত। يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلُوةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ
وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ * অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা নামায আদায়ের জন্য প্রস্তুত হও, তখন (সর্বপ্রথম) মুখমণ্ডল ধৌত কর। তারপর কনুইসহ দুই হাত ধৌত কর। তারপর মত্তক মাসেহ কর। অতঃপর টাখনুসহ দুই পা ধৌত কর। (১০) অঙ্গসমূহ পরস্পর লাগাতার ভাবে ধৌত কর, যেমন প্রথম অঙ্গের পানি শুকাইবার পূর্বেই অঙ্গ ধৌত করা।
অজুর মধ্যে দশটি সুন্নত রহিয়াছে; যথাঃ (১) অজুর পানিতে হাত দিবার পূর্বে উভয় হাত ভাল ভাবে ধৌত করিয়া লওয়া (২) মেসওয়াক করা (৩) গড়গড়ার সাথে কুলি করা। (৪) নাকের উভয় ছিদ্রে পানি পৌছাইয়া অভ্যন্তর পরিষ্কার করা। রোযার সময় হইলে কুলি করা ও নাকের ভিতরে পানি দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা, যেন হলকের মধ্যে পানি পৌছিয়া না যায়, (৫) দাড়ি খেলাল করা, (৬) উভয় চোখের মধ্যে পানি ঢালিয়া ধৌত করা, ডাহিন চক্ষু হইতে ধৌত শুরু করা, (৭) উভয় কান মাসেহ করার জন্য নূতন পানি লইয়া লওয়া, (৮) গরদান মাসেহ করা, (৯) উভয় হাত ও উভয় পা’র অঙ্গুলিসমূহ খেলাল করা, (১০) অজুর প্রত্যেক অঙ্গ তিন তিন বার করিয়া ধৌত করা। তাইয়াম্মুম: তাইয়াম্মুম করিবার রীতি এইরূপঃ উভয় হাত এইরূপ পাক মাটির উপর মারিবে যে স্বাভাবিক ভাবেই উভয় হাতে কিছু মৃত্তিকা লাগিয়া যায়। তাইয়াম্মুম শুরু করিবার কালে নিয়ত পাঠ করিবে। তাসমিয়া বলিবে। অতঃপর উভয় হাতের অঙ্গুলিসমূহ বিস্তৃত করিয়া একবার মাটির উপর মারিবে। অতঃপর হস্তদ্বয়ের পেটের দিক দ্বারা মুখমণ্ডল মাসেহ করিবে। তারপর আবার মাটিতে হাত মারিয়া প্রথমে বাম হাত দ্বারা ডান হাত এবং পরে ডান হাত দ্বারা বাম হাত মাসেহ করিবে।
সতরে আওরত: কোন পবিত্র কাপড় দ্বারা নাভী হইতে জানুতক এবং স্কন্দ পর্যন্ত ঢাকিয়া রাখা সতরে আওরত। সতরে আওরতের জন্য রেশমী কাপড় গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা রেশমী কাপড় দ্বারা নামায শুদ্ধ হয় না। কাহারও নিকট হইতে অপহৃত বা চুরিকৃত কাপড় দ্বারা নামায শুদ্ধ হয় না।
নামাযের স্থান: নামায পড়িবার জন্য এমন জায়গা চাই, যাহা নাপাক এবং অপবিত্রতা হইতে পাক-পবিত্র হয়। আর যদি কোন জায়গা এমন হয় যে, উহার উপর নাজাসাত্র আছে কিন্তু তাহা বাতাস এবং সূর্যের তাপে শুকাইয়া গিয়াছে, তবে সেই জায়গা পরিষ্কার করিয়া উহার উপর পাক কাপড় বিছাইয়া তাহার উপর নামায পড়া যাইবে।
নামাযের দিক: মক্কা মোয়াযযমা এবং তাহার নিকটবর্তী লোকগণ আইনে কাবার রোখ করিয়া নামায আদায় করিবে। আর মক্কা হইতে দূরবর্তী লোকগণও কাবার দিকে রোখ করিয়া নামায পড়িবে। আর কাবার দিক ঠিক করিবার জন্য নিজের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও তারকা, সূর্য এবং বায়ুর গতিমুখ দ্বারা কা’বার দিক ঠিক করতঃ সেদিকে রোখ করিয়া লইবে।
নামাযের নিয়ত: নিয়তের আসল স্থান হইল অন্তঃকরণ। (অর্থাৎ দিল বা অন্তঃকরণের এরাদার নাম নিয়ত) যেহেতু নামায আল্লাহর তরফ হইতে ফরজ করা হইয়াছে উহার উপর ইয়াকীন রাখিয়া এবং আল্লাহ তায়ালার হুকুম জানিয়া উহা আদায় করা ওয়াজিব। দেখাইবার উদ্দেশ্যে এবং অন্যকে
শুনাইবার জন্য নামায পড়া চাই না। নামায আদায় করিবার কালে নামায হইতে অবসর গ্রহণ না করা পর্যন্ত পুরাপুরিভাবে দিল আল্লাহর দিকে হাজির রাখা চাই। হাদীস শরীফে আসিয়াছে, হুযুরে পাক (দঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ) কে ফরমাইয়াছিলেন, যে নামাযে তোমার দিল আল্লাহর দিকে হাজির না থাকে তাহা কোন নামাযই নহে।
নামাযের ওয়াক্ত দিন রাত্রির অবস্থা স্বাভাবিক থাকিলে তো অবশ্য নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার
দ্বারাই নামাযের ওয়াক্তসমূহ ঠিক করিয়া লওয়া যায়। কিন্তু মেঘবাদল ইত্যাদির কারণে যদি অস্বাভাবিক অবস্থা দেখা দেয় যাহার ফলে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার দ্বারা ওয়াক্ত নির্দ্ধারণ করা সম্ভব হয় না, তখন ধারণার প্রাবল্যের উপর নির্ভর দ্বারা নামাযের ওয়াক্তের আন্দাজ করিয়া লইবে।
আরো পড়ুন: ইসলাম, ঈমান ও এহসান: দ্বীনের পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা
আযান: অভিজ্ঞতা বা ধারণার প্রাবল্য যেভাবেই হউক না কেন নামাযের ওয়াক্ত উপস্থিত হইলেই
এইভাবে আযান বলিবে। “আল্লাহু আকবার” চারিবার। ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ দুইবার।
‘আশহাদু আননা মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’ দুইবার। ‘হাইয়্যা আলাচ্ছ্যলাহ’ দুইবার। ‘হাইয়্যা আলাল ফালাহ’ দুইবার। ‘আচ্ছালাতু খাইরুম মিনান্নাউম’ দুইবার। (শুধু ফজরের ওয়াক্তের আযানে) ‘আল্লাহু আকবার’ দুইবার। ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ একবার।
ইক্বামত: ফরজ নামাযে দাঁড়াইয়া নিয়তের পূর্বেই একামত বলিতে হয়। একামতের কালামসমূহ
অবিকল আযানেরই অনুরূপ। অবশ্য হাইয়্যা আলাল ফালাহ বলিবার পরে একামতে অতিরিক্ত বাদক্বামাতিছ ছালাতু’ কালামটি দুইবার বলিবে এবং তাহার পরে আল্লাহু আকবার কালামটি বলিবে।
উল্লেখ্য যে, হাম্বলী ও শাফেয়ী মাযহাব মতে আযানে প্রথম হইতে হাইয়্যা আলাল ফালাহ পর্যন্ত প্রত্যেকটি কালাম একবার করিয়া পাঠ করিবে। পক্ষান্তরে হানাফী মাযহাবে উহা দুইবার করিয়া বলিতে হয়।
ইক্বামতের পরে নিয়ত করিয়া নামায শুরু করিতে হয়। নামাযের শুরুর তাকবীর অর্থাৎ তাকবীরে তাহ’রীমার বদলে আল্লাহ পাকের অন্য কোন তাজীমী কালাম বা শব্দ দ্বারা নামায শুরু করা জায়েয নহে।
নামাযের আরকানসমূহ: নামাযের আরকান মোট পনেরটি, যথাঃ
(১) দাঁড়াইয়া নামায পড়া, (২) তাকবীরে তাহরীমা অর্থাৎ আল্লাহ আকবার বলিয়া নামায শুরু করা, (৩) সূরা ফাতেহা পাঠ করা (৪) রুকু করা (৫) রুকুর মধ্যে অবস্থান করা (অর্থাৎ একটু বিলম্ব করা) (৬) রুকু হইতে দণ্ডায়মান হওয়া (৭) এসময় সামান্য বিলম্ব করা (৮) সিজদাহ করা
(৯) সিজদায় কিছু সময় অবস্থান করা (১০) উভয় সিজদাহর মধ্যে উঠিয়া বসা (১১) এই সময় একটু অপেক্ষা করা (১২) কা’দায় আখিরায় অর্থাৎ শেষ বৈঠকে বসা (১৩) এই বৈঠকে তাশাহহুদ পড়া (১৪) এই বৈঠকে দরূদ পাঠ করা (১৫) দুইদিকে সালাম ফিরাইয়া নামায শেষ করা। (উল্লেখ্য যে, উল্লিখিত রোকনসমূহ হাম্বলী মাযহাবে ফরজ হইলেও হানাফী মাযহাবে উহার মধ্যকার সাতটি রোকন মাত্র ফরজ, বাকীগুলি ফরজ নহে।)
নামাযের ওয়াজিবসমূহ: নামাযে ওয়াজিব নয়টি, যথাঃ (১) তাকবীর বলা, (তাকবীরে তাহরীমা ছাড়া) (২) রুকু হইতে উঠিবার কালে তাসমী অর্থাৎ সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ বলা, (৩) রাব্বানা লাকাল হামদ বলা (৪) রুকুর মধ্যে ‘সুবহানা রাব্বিইয়াল আ’লা বলা (৬) উভয় সিজদাহর মধ্যে উঠিয়া বসার কালে একবার রাব্বিগ ফিরলী পাঠ করা (৭) তাশাহহুদের পহেলা বৈঠক করা (৮) পহেলা বৈঠকে তাশাহুদ পড়া (৯) নামায হইতে বাহির হওয়ার নিয়তে সালাম ফিরান।
(উল্লেখ্য যে, উল্লিখিত ওয়াজিবগুলি হাম্বলী মাযহাব মতে ওয়াজিব কিন্তু হানাফী মাযহাবে এইগুলি ওয়াজিব নহে।)
নামাযের চৌদ্দটি সুন্নত: নামাযের সুন্নত চৌদ্দটি, (১) জায়নামাযে দাঁড়াইয়। নামায শুরুর আগে জায়নামাযের দোয়া পাঠ করা (২) তায়ায়্যুয পাঠ করা (৩) তাসমিয়া পাঠ করা (৪) সূরা ফাতিহা পাঠ করার পর আমীন বলা, (৫) সূরা ফাতিহার সহিত অন্য সূরা মিলাইয়া পড়া (৬) রাব্বানা লাকাল হামদ পাঠের পরে মিলায়াস সামাওয়াতি অল আরদ পাঠ করা (৭) রুকু ও সিজদাহর তাসবীহ একাধিকবার পাঠ করা (৮) দুই সিজদাহর মাঝে বসিবার কালে রাব্বিগফিরলী পড়া (৯) এক বর্ণনা মতে নাকের উপরে সিজদাহ করা। অর্থাৎ সিজদাহর ভিতরে নাককে যমিনের সাথে মিলাইয়া রাখা (১০) উভয় সিজদাহর মাঝে আরামের উদ্দেশ্যে একটু বসা (১১) নামাযের মাঝে চারিটি জিনিস হইতে আশ্রয় কামনা করা; যথাঃ (ক) মরদুদ শয়তান (খ) কবর আযাব, (গ) মালউন দাজ্জাল এবং (ঘ) জীবন ও মৃত্যুর ফেতনা হইতে নিরাপত্তা প্রার্থনা করা (১২) শেষ বৈঠকে দরূদ শরীফ পড়িবার পরে দোয়া মাছুরা পাঠ করা (১৩) বেতেরের নামাযে দোয়া কুনুত পাঠ করা (১৪) দ্বিতীয় বার সালাম ফিরান। (উল্লেখ্য যে, উল্লিখিত সুন্নতসমূহ হাম্বলী মাযহাব মতে সুন্নত হইলেও হানাফী মাযহাব মতে সবগুলি সুন্নত নহে।)
নামায পাঠ-প্রণালী: (১) নামায শুরু করিবার কালে, রুকুতে যাইবার কালে, রুকু হইতে মাথা
উঠাইবার কালে উভয় হাত এইভাবে উত্তোলন করিবে যে, উহা যেন দুই কাঁধ বরাবর উঠে এবং হাতের অঙ্গুলিসমূহ কানের লতি পর্যন্ত পৌছিয়া যায়, এই ভাবে হাত উঠাইয়া আবার উহা ছাড়িয়া দিবে (২) তারপর নাভীর উপরে বাম হাত রাখিয়া তাহার উপরে ডান হাত রাখিয়া দিবে, (৩) কিয়ামে চোখের দৃষ্টি থাকিবে সিজদাহর স্থানের দিকে, (৪) যে সকল নামাযে কিরাত বুলন্দ আওয়াজে পড়ার বিধান আছে, সে সব নামাযে কিরাত বুলন্দ আওয়াজে পড়িবে এবং আমীন লফজও আওয়াজের সাথে পড়িবে। পক্ষান্তরে যে সকল নামাযে কিরাত নীরবে পড়ার বিধান সে সকল নামাযে নীরবে কিরাত পড়িবে এবং আমীন লফজও নীরবে পড়িবে। রুকুর ভিতরে দুই হাত দুই জানুর উপর রাখিবে। রুকুর পরে পিঠ সোজা করিয়া দাঁড়াইয়া যাইবে। সিজদাহর মধ্যে দুই হাতের বাহু দুই পাঁজর হইতে পৃথক করিয়া রাখিবে। সিজদায় যাইবার কালে দুই হাঁটু যমিনের উপর প্রথম রাখিবে, তারপর দুই হাত রাখিবে। সিজদাহর মধ্যে দুই রানকে পেট ও চোতর হইতে পৃথক রাখিবে। সিজদাহর মধ্যে দুই হাঁটু পরস্পর পৃথক রাখিবে। উভয় সিজদার মাঝে বসিবার কালে এবং কা’দায় উলা ও কা’দায় আখিরের বৈঠকে বাম পা বিছাইয়া তাহার উপর বসিবে এবং ডান পা খাড়া করিয়া রাখিবে। এ সময় ডান জানুর উপর ডান হাত এবং বাম জানুর উপর বাম হাত স্থাপন করিবে। হাতের অঙ্গুলিসমূহ পরস্পর মিলাইয়া রাখিবে। তাশাহহুদের ভিতরে আশহাদু শব্দ বলিবার সময় ডান হাতের শাহাদাত অঙ্গুলি দ্বারা ইশারা করিবে।
উল্লেখ থাকে যে, নামাযের উল্লিখিত শর্ত ও রোকন সমূহের কোন একটি ইচ্ছায়, অনিন্দ্যয় বা ভুলবশতঃ ছুটিয়া গেলে নামায বাতিল হইয়া যাইবে। আর যদি নামাযের ওয়াজিব সমূহের কোন
-একটি ভুলবশতঃ ছুটিয়া যায়, তবে সিজদাহসোহ আদায়ের দ্বারা নামায আদায় হইয়া যাইবে। কিন্তু কোন ওয়াজিব জানিয়া বুঝিয়া স্বেচ্ছায় ছাড়িয়া দিলে নামায বাতিল হইয়া যাইবে। নামাযের কোন সুন্নত বা রীতি-নীতি তরক করিলে নামায বাতিল হইবে না এবং সিজদাহ সোহও লাযেম হইবে না।
আরো পড়ুন:দরূদ শরিফের গুরুত্ব, ফজিলত ও দোয়া কবুলের রহস্য
যাকাত
– মুসলমানদের উপর যাকাত সেই সময় ওয়াজিব হয়, যখন সে ছাহেবে নেছাব রূপে গণ্য হয়। (অর্থাৎ যাকাত তাহারই দিতে হয়, যাহার নিকট যাকাত ওয়াজিবকারী পরিমাণ মাল মৌজুদ হয়) যাকাতের নেছাব হইল ত্রিশ মেছকাল (অর্থাৎ সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ) অথবা দুইশত দেরহাম (অর্থাৎ বায়ান্ন ভরি রৌপ্য) কিংবা উক্ত দুই বস্তুর কোন একটির মূল্যের পরিমাণ ব্যবসায়ের পণ্য বা পাঁচটি উষ্ট্র বা ত্রিশটি গাভী বা মহিয অথবা চল্লিশটি বকরী। তবে শর্ত হইল, এইসব জন্তু যখন সারা বৎসর ভরিয়া স্বাস্থীন ভাবে জঙ্গলে প্রান্তরে খাদ্য খাইয়া জীবন ধারণ করে। গোলাম এবং ক্রীতদাসের উপরে যাকাত ওয়াজিব নহে।
উটের নেছাব: পাঁচটি উটের জন্য একটি ছয় মাসের ভেড়া বা একটি এক বৎসর বয়স্ক বকরী যাকাত দিতে হয়। আর দশটি উটের জন্য ঐরূপ দুইটি ভেড়া বা দুইটি বকরী যাকাত দিতে হয়। পনেরটি উটের জন্য ঐরূপ তিনটি ভেড়া বা তিনটি বকরী যাকাত দিতে হয়। বিশটি উটের জন্য ঐরূপ চারটি ভেড়া বা চারটি বকরী যাকাত দিতে হয়। আর ছাব্বিশটি উটের মালিককে পূর্ণ এক বৎসর বয়স্কা উন্ত্রী যাকাত দেওয়া ওয়াজিব হয়। আর যদি তাহার নিকট এক বৎসর বয়স্কা উষ্ট্রী না থাকে, তবে তাহাকে দুই বৎসরের অধিক বয়স্কা একটি উন্ত্রী যাকাত দিতে হয়। ছত্রিশটি উটের মালিক দুই বৎসর বয়স্কা এইটি উষ্ট্রীয় যাকাত দিবে। ছিচাল্লিশটি উটের মালিক তিন বৎসর বয়স্ক একটি উষ্ট্র যাকাত দিবে। একষট্রিটি উটের মালিক চারি বৎসর অতিক্রম করতঃ পাঁচ বৎসর বয়সে উপনীত একটি উট যাকাত দিবে। ছিয়াত্তরটি উটের মালিক দুই বৎসর বয়স্কা দুইটি উস্ত্রী যাকাত দিবে। এইভাবে একানব্বই হইতে একশত বিশটি উটের মালিককে তিন বৎসর বয়স্ক দুইটি উট যাকাত দিতে হইবে। এই সংখ্যা হইতে যদি মাত্র একটি উটও বেশী থাকে তবে তাহাকে প্রতি চল্লিশটি উটের বদলে দুই বৎসর বয়স্কা একটি উন্ত্রী যাকাত দিতে হইবে এবং প্রতি পঞ্চাশটি উটের বদলে তিন বৎসর বয়স্ক একটি উট যাকাত দিতে হইবে।
গরু-মহিষের যাকাতের নেছাব কেহ ত্রিশটি গরু বা মহিষের মালিক হইলে এক বৎসর বয়স্ক এটি নর গরু বা নর মহিষ যাকাত দিবে। আর যদি কেহ চল্লিশটি গরু বা মহিষের মালিক হয়, তবে তাহাকে দুই বৎসর বয়স্ক একটি গরু বা একটি মহিষ যাকাত দিতে হইবে। আর যাটটি গরু বা মহিষের মালিক হইলে এক বৎসর বয়স্ক দুইটি গরু বা মহিষ যাকাত দিবে। আর গরু বা মহিষের সংখ্যা সত্তরের কোঠায় পৌছিলে উহার মালিককে এক বৎসর বয়স্ক একটি গরু বা মহিষ এবং দুই বৎসর বয়স্ক আর একটি গরু বা মহিষ যাকাত দিবে। এইভাবে ত্রিশটি গাভীর জন্য এক বৎসর বয়স্ক একটি গাভী এবং প্রত্যেক চল্লিশটি গাভী বা মহিষের জন্য দুই বৎসর বয়স্ক একটি গাভী বা মহিষ যাকাত দিবে।
বকরীর নেছাব: চল্লিশ হইতে একশত বিশটি পর্যন্ত বকরীর জন্য একটি বকরী যাকাত দিতে হয়। আর যদি বকরীর সংখ্যা উহার উর্ধে হয়, তবে উর্ধে দুইশতটি বকরীর জন্য দুইটি বকরী বা ভেড়া যাকাত দিবে। আর যদি বকরীর সংখ্যা দুইশত অপেক্ষা একটি ও বেশী হয়, তবে উক্ত সংখ্যা হইতে তিনশতটি পর্যন্ত তিনটি বকরী বা ভেড়া যাকাত দিবে। ইহার পরে প্রতিটি শতে একটি করিয়া বকরী বা ভেড়া যাকাত দিবে।
যাকাত পাওয়ার যোগ্য কাহারা
জট প্রকার লোক যাকাতের মাল লাভের উপযুক্ত। পবিত্র কোরআনেই এইরূপ উক্ত হইয়াছে; যথাঃ (১) একেবারে নিঃস্ব অর্থাৎ যাহার নিকট জীবন ধারণের উপযোগী কিছুই নাই, (২) দরিদ্র অর্থাৎ যাহার নিকট সামান্য মাল থাকিলেও তাহা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য (৩) যাকাত সংগ্রহ ও আদায় প্রভৃতি কাজে নিযুক্ত কর্মচারী (৪) এই ধরনের বেদ্বীন যাহাদেরকে যাকাতের মাল দিলে
তাহাদের মুসলমান হওয়ার সম্ভাবনা আছে। অন্ততঃপক্ষে যাহারা যাকাতের মাল লাভ করিলে
মুসলমানদের উপর কোনরূপ জুলুম অত্যাচার বা দুশমনী হইতে বিরত থাকে, (৫) গোলাম বা ক্রীতদাসগণ তাহাদের আজাদ হওয়ার জন্য (৬) এই ধরনের করজদার ব্যক্তি, যাহার করজ শোধ করার মত কোন সম্বল নাই। (৭) যে সকল মুসলিম মুজাহিদ বিনা পারিশ্রমিক বা বিনা ভাতায় কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রত (৮) ও এইরূপ মুসাফির যে খরচের অভাবে প্রবাস হইতে স্বদেশে ফিরিতে অসমর্থ হইয়া বিদেশে পড়িয়া আছে।
নফল দান ও খয়রাত: ফরজ যাকাত আদায় করিবার পরে আরও অতিরিক্ত দান-খয়রাত করা
সর্বযুগে ও সর্বসময়েই মুস্তাহাব। বিশেষতঃ বরকতের মাস এবং দিনসমূহে দান-খয়রাত করা আরও বেশী উত্তম। উদাহরণ স্বরূপ রজব, শাবান এবং রমজান প্রভৃতি মাস ও ঈদের দিনগুলি, মহররমের দশদিন, দুর্ভিক্ষ ও অভাব-অনটনের দিন প্রভৃতিতে দান খয়রাত করা অত্যন্ত ছওয়াবের কাজ। নফল ছদকা ও দান-খয়রাতকারীদের মালে আল্লাহ তায়ালা বরকত এবং ভালাই দান করেন এবং তাহাদের পরিবার-পরিজন আল্লাহর রহমতে সুখে-শান্তিতে ও নিরাপদে থাকে। ইহাছাড়া পারলৌকিক পুণ্য তো রহিয়াই গিয়াছে।
ছদকায়ে ফিত্র
যাহার নিকট নিজের ও নিজের পরিবারবর্গের জরুরী খরচপত্র বাদেও অতিরিক্ত মাল থাকে, তাহার জন্য ছদকায় ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। ঈদের রাত্রে কিংবা দিনে নিজের, নিজের সন্তান-সন্ততির, স্ত্রীর, চাকর-চাকরানীর, পিতা-মাতা, ভাই-ভগ্নির এবং ভরণ-পোষণের দায়িত্বগ্রস্ত অন্যান্য ঘনিষ্ঠ ও নিকটবর্তী আত্মীয়দের তরফ হইতে ছদকায় ফিতর আদায় করিবে।
ছদকায় ফিতরের পরিমাণ: খেজুর, কিসমিস, গম, যব, ছাতু, আটা প্রভৃতি এক ছায়া, যাহা ওজনে ইরাকী সাড়ে পাঁচ রতলের সমান। আর যে সকল শহরে বা এলাকায় উল্লিখিত জিনিসগুলি না থাকে, সেখানে যে সকল খাদ্যশস্য পাওয়া যায়, তাহা বা উল্লিখিত দ্রব্যের মূল্য দিয়া ছদকায় ফিতর আদায় করিবে।
আরো পড়ুন:ইসলামে ফেতরাত: একটি পর্যালোচনা
রোযা
যখন পবিত্র রমজান মাস উপস্থিত হয়, তখন সকল মুসলমানের উহাতে রোযা রাখা ওয়াজিব। যেমন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করিয়াছেনঃ যে ব্যক্তি তোমাদের মধ্যে মাহে রমজানের সাক্ষাত লাভ করে, সে যেন তাহাতে রোযা আদায়ে করে।
নিজে চাঁদ দেখিয়া বা কোন নির্ভরযোগ্য মুমিন মুসলমানের কাছে চাঁদ দেখার সাক্ষ্য লাভ করিয়া কিংবা শাবান মাসের ত্রিশ তারিখ রাত্রে আকাশে মেঘ বাদল থাকায় চাঁদ না দেখিলেও ঐ দিন শাবান মাসের শেষ দিন বিধায় রমজানের আগমন সাব্যস্ত হওয়া সাপেক্ষে উহার পরদিন রোযা রাখিবে এবং মাগরিবের ওয়াক্ত হইতে ছোবেহ ছাদেক তুলু হওয়া পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যে কোন সময়ে নিয়ত করিবে। সমগ্র মাসের প্রত্যেক দিনই এইভাবে নিয়ত করিবে। একটি দুর্বল রেওয়ায়েতে অবশ্য এইরূপও আসিয়াছে যে, যদি রমজান মাসের প্রথম রাত্রে একই সাথে সারা ‘মাসের রোযার নিয়ত করিয়া লয়, তাহাতেই হইয়া যাইবে।
রোযার মধ্যে পালনীয় বিষয় হইল, সূর্যোদয়ের পূর্ব মুহূর্ত হইতে সারা দিন (সূর্যাস্ত) পর্যন্ত পানাহার এবং স্বামী-স্ত্রী সহবাস হইতে বিরত থাকিবে। বাহির হইতে কোন জিনিসই যেন পেটের মধ্যে প্রবেশ না করে। শরীরে নিজে সিংগা লাগাইবে না, অন্যের দ্বারাও লাগাইবে না। বমি করিবে না।
এমন কোন কাজ করিবে না, যাহাতে বীর্যপাতের উপক্রম হয়।
কাজা ও কাফ্ফারা: উপরোক্ত পালনীয় বিষয় হইতে যদি কোন একটি বিষয় অনিচ্ছাকৃত ভাবে * ছুটিয়া যায়, তবে তাহার জন্য উক্ত রোযার কাজা লাযেম হয়। কাজা রোযা আদায় কালেও মূল রোযার সমস্ত বিষয় পুরাপুরি ভাবে আদায় করা প্রয়োজন।
আর উক্ত পালনীয় বিষয়ের কোন একটি বিষয় যদি ইচ্ছাকৃতভাবে পালন করা না হয় অর্থাৎ উহার কোন একটি ছুটিয়া যায়, তবে এরূপ ক্ষেত্রে উক্ত রোযার জন্য কাফফারা আদায় করা ওয়াজিব হয়।
কাফফারার নিয়ম হইল, একটি রোযার কাফ্ফারা স্বরূপ একাধারে লাগাতারভাবে দুই মাস অর্থাৎ ষাটটি রোযা আদায় করিতে হয়। মাঝে একটি রোযা কোনক্রমে ভঙ্গ হইলে আবার নূতন করিয়া লাগাতার ভাবে যাটটি রোযা রাখিতে হয়।
কাফফারা আদায়ের দ্বিতীয় নিয়ম হইল, যাটজন মিসকীনকে একবেলা আসুদাভাবে খানা খাওয়াইতে হয়। অথবা একজন মিসকীনকে পুরা এক মাস প্রতিদিন দুইবেলা আসুদাভাবে খানা খাওয়াইতে হয়।
কাফফারা আদায়ের তৃতীয় নিয়ম হইল, কোন মুসলমান গোলাম বা বাঁদী দাসীকে মুক্ত করিয়া দেওয়া। তবে তাহার শর্ত হইল, উক্ত গোলাম বা দাসী-বাঁদী সুস্থ সবল এবং কর্মক্ষম হওয়া চাই। লেংড়া, লুলা, অন্ধ বা বয়রা হইলে চলিবে না। অবশ্য রোযা তরককারী যদি উল্লিখিত কাফফারার নিয়মসমূহের কোন একটি নিয়ম পালনেই সমর্থ না হয় তবে সে শুধু আল্লাহর দরবারে তাওবা করতঃ ক্ষমা চাহিতে থাকিবে এবং অন্যান্য দিনসমূহে উত্তম আমলসমূহ করিতে থাকিবে।
রমজান মাসের দিবা ভাগে রোযা রাখিয়া কোন যুবতী নারীর নির্জন ও নিবিড় সাহচর্যে অবস্থান করিবে না। তাহাকে চুম্বন করিবে না, চাই সে মাহরাম নারীই হউক না কেন। সূর্য পশ্চিম দিকে অধিক গড়াইবার পর মেসওয়াক করিবে না। মুখের মধ্যে বেশী পরিমাণে থুক জমা করিয়া গলাধঃকরণ করিবে না। কোন কিছু রান্না করিবার কালে উহার নেমকের বেশী-কম দেখা বা জিহ্বায় দিয়া স্বাদ পরীক্ষা করা হইতে বিরত থাকিবে।
রোযা রাখিয়া কাহারও গীবত, শেকায়েত করা, কোন প্রকার ক্ষতি লোকসান করা, মিথ্যা কথা বলা ও কাহাকেও গালি-গালাজ করা হইতে পরহেজ করিবে।
সেহরী খাওয়া ও ইফতার করা: আকাশে মেঘ বাদল থাকিলে ইফতারে দেরী করা চাই। অবশ্য স্বাভাবিক অবস্থায় ইফতারে জলদি করাই মুস্তাহাব।
যাহাদের পক্ষে ছোবহে ছাদেকের আগমন অনুধাবন করা সম্ভব নহে, (যেমন অন্ধ বা নজরে ক্ষীণ প্রভৃতি লোক।) তাহাদের জন্য বিলম্ব করিয়া সেহরী খাওয়া চাই না। বরং ইহারা তাড়াতাড়ি সেহরী খাইবে। অবশ্য কোনরূপ অসুবিধা মুক্ত লোকদের জন্য রাত্রির শেষ প্রহর পর্যন্ত অপেক্ষা করিয়া সেহরী খাওয়া উত্তম।
ইফতারের মধ্যে উত্তম নিয়ম হইল, খেজুর এবং পানি দ্বারা ইফতার করা, আর হুযুরে পাক (দঃ) বর্ণিত নিম্নোক্ত দোয়াটি পাঠ করা। যেমন হুযুরে পাক (দঃ) এরশাদ ফরমাইয়াছেন, কোন রোযাদার ব্যক্তির সামনে সন্ধ্যার খানা হাজির করার পর সে নিম্নোক্ত দোয়া পাঠ করিয়া ইফতার করিবে।
دعا بسم اللهِ اللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَعَلَى رِزْقِكَ أَنْطَرْتُ سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ اللَّهُمَّ تَقَبَّلْ مِنَّا فَإِنَّكَ السَّمَكَ أَنَّكَ الْعَلِيمُ *
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু, অ আলা রিযকিকা আফতারতু সুবহানাকা অ বিহামদিকা আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল মিন্না ফাইন্নাকা আনতাস সামীউল আলীম।
আরো পড়ুন:রতী সাধন: আধ্যাত্মিক ও জাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি
ই’তিকাফ
মুসলমানদের জন্য ই’তিকাফ করা মুস্তাহাব। ই’তিকাফের জন্য এমন মসজিদে বসা চাই, যে মসজিদে বা-জামাত নামায আদায় করা হয়। এ ব্যাপারে সর্বোত্তম হইল, জামে মসজিদে ই’তিকাফে বসা। তাহাতে ফায়েদা এই যে, ই’তিকাফের মধ্যে জুময়ার দিন আসিয়া পড়িলে ই’তিকাফকারী ই’তিকাফের স্থানে বসিয়া জুময়ার নামাযও আদায় করিতে পারে। ই’তিকাফকারীর জন্য রোযাদার হওয়া অত্যুত্তম। রোযা রাখিয়া এ’তেকাফ করা উত্তম হওয়ার কারণ হইল, রোযা ই’তিকাফের মকছুদ হাসিলের ক্ষেত্রে সাহায্য করিয়া থাকে। উপরন্তু উহা নফসে আম্মারার কুবাসনাসমূহকে নির্মূল করে। ই’তিকাফের শাব্দিক অর্থ নিজে নিজেকে কোন খাস জায়গায় আবদ্ধ করিয়া রাখা, কোন কাজের উপর আঁকড়িয়া থাকা এবং কোন বস্তুর অভ্যাস অবলম্বন করা।
ই’তিকাফ কার্যটি হুযুরে পাক (দঃ) এর সুন্নত এবং ইহা সাহাবীদেরও সুন্নত। হুযুরে পাক (দঃ) প্রত্যেক রমজান মাসের শেষ দশদিন ই’তিকাফ করিতেন এবং রেহলত পর্যন্ত তাঁহার এই অভ্যাস বহাল ছিল। তিনি স্বীয় সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)কে এ কাজের জন্য আহ্বান করতঃ বলিয়াছিলেন, তোমাদের যে কেহ ই’তিকাফ করিতে চাহে, সে যেন রমজান মাসের শেষ দশদিন ই’তিকাফ করে। ই’তিকাফকারীর জন্য ই’তিকাফ কালে শুধু আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপযোগী কার্যসমূহই করা চাই। যেমন নামায, কোরআন তেলাওয়াত, তাসবীহ-তাহলীল, যিকির-আযকার, মোরাকাবা-মোশাহাদা ইত্যাদি। ই’তিকাফ কালে কোন রূপ পার্থিব ও বেকার কথাবার্তা হইতে পরহেজ করা চাই। দ্বীনী এলম এবং কোরআন শরীফ পাঠ শিক্ষা করা বা শিক্ষা দেওয়া জায়েয আছে। কোরআন পাঠ এবং দ্বীনী এলম শিক্ষা দেওয়ায় নিজে ছাড়া অপরেরও ফায়েদাহ হাসিল হয়। সুতরাং ইহা ঐ শ্রেণীর ইবাদত হইতে উত্তম যাহার দ্বারা কেবল আবেদ একাই ফায়েদাহ হাসিল করিতে পারে।
ই’তিকাফ কালে ই’তিকাফকারী শুধু মাত্র পেশাব-পায়খানা, অজু-গোসল ইত্যাদির জন্য বাহিরে আসিতে পারে। তাহা ছাড়া জুমআর নামায আদায়ের জন্য জামে মসজিদে গমন করা ও এ’তেকাফকারীর কোন কঠিন রোগ বা প্রাণ হানিকর কোন অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার কারণে বাহিরে যাওয়া যায়েয আছে।
হজ্ব এবং ওমরাহ
শরায়েতে হজ্ব: কোন মুসলমান ব্যক্তির ভিতরে যখন হজ্জ্বের যাবতীয় শর্তসমূহ পাওয়া যায়, তখন তাহার উপর বিলম্ব না করিয়া সাথে সাথেই হজ্ব আদায় করা ফরজ হইয়া যায়। হজ্জ্বের শর্তসমূহ
নিম্নে উদ্ধৃত করা হইল। (১) মুসলমান ব্যক্তির আজাদ হওয়া অর্থাৎ পরাধীন না হওয়া (২) আকেল হওয়া, (৩) বালেগ হওয়া, (৪) পাগল না হওয়া (৫) ধন-সম্পদ মৌজুদ থাকা, (৬) হজ্জ্বের পথ বিপদাপদ হইতে নিরাপদ থাকা (৭) সময়ের মধ্যে এতটা প্রসারতা থাকা যে, রওয়ানা করিয়া গিয়া হজ্ব করা যাইতে পারে (৮) সন্তান-সন্ততি ও পরিবার-পরিজনের ভরণ পোষণ বাবত এই পরিমাণ
মাল মৌজুদ থাকা যে, হজ্ব করিয়া ফিরিয়া আসা পর্যন্ত তাহাতে তাহাদের চলিতে পারে। (১) তাহাদের বসবাসের জন্য বসত গৃহাদির ব্যবস্থা থাকা (১০) করজদার থাকিলে করজ পরিশোধ করিয়া যাওয়া।
উল্লিখিত শর্তসমূহের ব্যতিক্রমাবস্থায় হজ্ব যাত্রা করিলে তাহাতে ছওয়াবের বদলে গুনাহ লাযেম হইয়া থাকে।
ইহরাম বাঁধিবার মীকাত
হজ্জ যাত্রীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থানে গিয়া ইহরাম বাঁধিয়া মক্কা পৌছিতে হয়। মক্কা যোয়াযযমার একেক দিকের লোকের জন্য একেকটি স্থানকে মীকাত ধার্য্য করা হইয়াছে। যেমনঃ পশ্চিমাঞ্চলীয় লোকদের জন্য মীকাত হইল জুখফা। পূর্বাঞ্চলীয় লোকদের জন্য যাতে-এরক, মদীনাবাসীদের জন্য যুল-হোলায়ফা, ইয়ামনবাসীদের জন্য ইয়ালামলাম এবং নজদবাসীদের জন্য কারণ।
উল্লিখিত শরয়ী মীকাতে পৌছিয়া গোসল করিয়া পাক-পবিত্র হইবে। পানির অভাবে তাইয়াম্মুম করিয়া লইবে। তারপর লুঙ্গি এবং চাদর পরিধান করিবে। লুঙ্গি এবং চাদর উভয়ই সাদা ও পাক-পবিত্র হইতে হইবে। অতঃপর (শরীরে ও কাপড়ে) খোশবু লাগাইয়া দুই রাকয়াত নামায আদায় করতঃ ইহরাম বাঁধিবে। ইহরামের নিয়ত দেলী ও যবানী উভয় ভাবেই করিতে হইবে।
যদি শুধু তামাকু, হজ্ব করিতে চায়, তবে কেবল ওমরার জন্য আর যদি শুধু হজ্জ্ব করিতে চায় তবে শুধু হস্যের জন্য, আর যদি উভয় এক সাথে করিতে চায় তবে একই সাথে উভয়ের নিয়ত করিবে। নিয়ত এইঃ
اللَّهُمَّ إِنِّي أُرِيدُ الْعُمْرَةَ। يَا اللَّهُمَّ إِنِّي أُرِيدُ الْحَجَّ – يَا أَللَّهُمَّ
اني أريدُ الْعُمْرَةَ وَالْحَجَّ جَمِيعًا فَبَشِّرُ ذَلِكَ لِي وَتَقَبَّلُ مِنِّي *
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী উরীদুল উমরাতা ইয়া আল্লাহুম্মা ইন্নী উরীদুল হাজ্জা ইয়া আল্লাহুম্মা ইন্নী উরীদুল উমরাতা অল হাজা জামীআন ফাইয়াসির যালিকা লী অ তাকাব্বাল মিন্নী।
নিয়তের পরে তালবিয়া পাঠ করিবে। তালবিয়া এই:
لبيك اللهُمَّ لَبَّيْكَ لا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ
وَالْمُلْكَ لَكَ لَأَشَرِيكَ لَكَ *
উচ্চারণ: লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা লাশারীকা লাকা লাব্বাইকা ইন্নাল হামদা অগ্নি’মাতা লাকা অল মুলকা লাকা লা শারীকা লাকা।
ইহরামের মাসায়েল: (১) ইহরাম বাঁধিবার পর আর কখনও মাথা ঢাকিবে না (২) সেলাইকৃত কাপড় পরিধান করিবে না (৩) মোজা পরিধান করিবে না। এইসব নিষিদ্ধ কাজের কোন কিছু করিয়া ফেলিলে একটি বকরী কোরবানী করা অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু যদি বিনা সিলাইর কাপড় এবং জুতা না মিলে তবে সে অবস্থায় সেলাইকৃত কাপড় এবং জুতাই পরিধান করিবে। ইহরাম বাঁধিবার ∎ পরে স্বীয় শরীর এবং কাপড়ে কোন প্রকার খোশবু লাগাইবে না। যদি ইচ্ছাকৃতভাবে খোশবু লাগায় তবে কাপড় ধৌত করিতে হইবে এবং একটি বকরী কোরবানী করা ওয়াজিব হইবে।
ইহরাম বাঁধিবার পর নখ কর্তন এবং চুল কর্তনও নিষিদ্ধ। তিনটি নখ কর্তন বা তিন গাড়ি চুল মুণ্ডনের জন্য একটি বকরী কোরবানী দিতে হয়। যদি তিনটির কম নখ কর্তন করে বা তিন গাছির কম চুল মুণ্ডন করে, তবে প্রত্যেকটি নখ এবং প্রত্যেক গাছি চুলের বদলে দশ ছটাক করিয়া গম ছদকা করিবে।
ইহরাম অবস্থায় নিজে বিবাহ করা বা অন্যের বিবাহে শরীক হওয়া উভয়ই নিষেধ। স্বীয় স্ত্রী বা দাসী-বাঁদীর সহিত সহবাস করাও ইহরামের হালতে নিষিদ্ধ। অবশ্য স্ত্রীর নিকট আসা যাওয়া করা নিষিদ্ধ নয়। উপরোক্ত নিয়মসমূহের বিপরীত কাজ করিলে হজ্ব বাতিল হইয়া যায়। অবশ্য আকাবায় পাথর মারিবার পূর্বে সহবাস হইলে তখনই হজ্ব বাতিল হইবে নতুবা নহে। যদি ইচ্ছাপূর্বক স্বীয় বীর্যপাত করে, অথবা পুনঃ পুনঃ স্ত্রীর দিকে তাকাইবার ফলে বীর্যপাত ঘটে, তবে ইহার কাফফারা স্বরূপ একটি বকরী কোরবানী দিতে হইবে।
পশু শিকার এবং কীট-পতঙ্গ মারা
নিজে শিকার করা বা অন্যের দ্বারা শিকার করান (যেমন শিকারে উৎসাহ দেওয়া, সাহায্য করা, পর দেখাইয়া বা পন্থা বাতাইয়া দেওয়া, যবেহ করিতে সাহায্য করা, শিকারের হাতিয়ার সরবরাহ করা) ইহা সব কিছুই নিষিদ্ধ। যদি এই সকল কাজের কোন একটি কাজ করা হয়, তবে শিকারকত জন্তুর অনুরূপ একটি জন্তুর দ্বারা উহার কাফফারা করিতে হইবে। গৃহপালিত জন্তুকে মোহরেম ব্যক্তির জন্য যবেহ করা ও উহার গোশত খাওয়া জায়েয। পিপীলিকা কষ্ট দিলে তাহাও মারা জায়েয বলিয়া এক রেওয়ায়েতে রহিয়াছে। তবে অন্য রেওয়ায়েতে আছে যে, সম্ভবমত কিছু দান-খয়রাত করা জরুরী। হরম শরীফে অবস্থানরত কোন জানোয়ারকে গায়রে মোহরেম ব্যক্তিও হত্যা করিবে না। এরূপ করিলে ইহরাম বাঁধা অবস্থার শিকার হত্যা করার অনুরূপ কাফফারা দিতে হইবে।
হরম শরীফের বৃক্ষসমূহও কাটিবে না, উৎপাটন করিবে না। এইরূপ করিলে বড় বৃক্ষের বদলে একটি গাভী এবং ছোট বৃক্ষের বদলে একটি ভেড়া কোরবানী করিবে।
উল্লেখ্য যে, মদীনা মোনাওয়্যারার জীব-জন্তু এবং বৃক্ষসমূহেরও হুকুম এইরূপ। তবে পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, প্রতিবিধানে শুধু ঐ ব্যক্তির কাপড় ছিনিয়া লওয়া হইবে। আর ঐ ছিনতাইকৃত কাপড় ছিনতাইকারীর জন্য হালাল হইবে।
হজ্জ্বের মাসয়ালা
যদি সময় হাতে থাকে ও ইয়াওমে আরাফার কয়েকদিন পূর্বেই মক্কায় প্রবেশ করা সম্ভব হয়, তবে মুস্তাহাব এই যে, খুব ভালভাবে গোসল করিয়া মক্কার উচ্চাঞ্চলের দিক হইতে প্রবেশ করিবে। মসজিদে হারামের নিকটে পৌছিয়া বাবে বনু শায়বা হইতে হরম শরীফের ভিতরে ঢুকিবে এবং খানায় কাবা দৃষ্টির সম্মুখে আসিবামাত্রই দুই হাত উছাইয়া বুলন্দ আওয়াজে এই দোয়া পাঠ করিবে।
اللَّهُمَّ إِنَّكَ أَنْتَ السَّلَامُ وَمِنْكَ السَّلَامُ حَيْنَا رَبَّنَا بِالسَّلَامِ اللَّهُمَّ زِدْهُذَا الْبَيْتَ تَعْظِيمًا الْبَيْتَ تَعْظِيمًا وَتَفَيْتًا وَتَعْظِيمًا وَتَعْظِيمًا وَمَهَا بَةً وَبَّرًا وَزِدْ مَنْ شَرَفَهُ وَعَظَمَتَهُ مِمَّنْ حَجَّةَ أَوِاعْتَمَرَهُ تَعْظِيمًا وَتَشْرِيفًا وَتَكْرِيمًا وَمَهَابَةٌ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ كَثِيرًا كَمَاهُوَ كَثِيرًا كَمَاهُوَ أَهُمَ وَهْاْ يَنْبَغِي بِكَرَمِ وَجْهِكَ وَعِرْكَ وَجَلَالِكَ – الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي بَلْغَنِي بَيْنَهُ وَرَانِي لِذَالِكَ أَهْلاً وَالْحَمْدُ لِلَّهِ عَلَى كُلِّ حَالٍ – اللَّهُمَّ دَعَوْتَ إِلَى حَجِّ بَيْتِكَ وَقَدْ جِئْنَ اللهَقَلَكَ – وَقَدْ جِئْنَ اللهَقَلَكَ – مِنِّي وَاعْفُ عَنِّي وَأَدْ لِعْ لِى شَانِي كُلَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ *
তাওয়াফ: অতঃপর এবতেদায়ী তাওয়াফ অর্থাৎ তাওয়াফে কুদুম করিবে। এ সময় ডান দিকের স্কন্ধ খোলা রাখিয়া চাদর দ্বারা বাম স্কন্ধ ঢাকিয়া লইয়া হাজরে আছওয়াদের নিকট আসিয়া উহা হাত দ্বারা স্পর্শ করিবে এবং সম্ভব হইলে মুখ দ্বারা চুম্বন করিবে। আর সম্ভব না হইলে নিজের হস্ত চুম্বন করিবে। আর অধিক ভীড়ের কারণে হাজরে আছওয়াদের কাছে আসিতে না পারিলে এবং উহা স্পর্শ করিতে না পারিলে উহার দিকে হাত বাড়াইয়া ইশারা করিবে এবং নিম্নোক্ত দোয়া পাঠ করিবে।
بسمِ اللهِ وَاللهُ أَكْبَرُ – اللَّهُمَّ إِيمَانًا بِكَ وَتَصْدِيقًا بِكِتَابِكَ وَوَفَاءَ بِعَهْدِكَ وَاتَّبَاعَالِسُنَّةِ نَبِيُحَلَهُ اللَّهْدِكَ وَاتَّبَاعَالِسُنَّةِ نَبِيُهُمَلَّكَ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ *
তাওয়াফ ডান দিক হইতে শুরু করিবে। উহার পর বাইতুল্লাহর দরওয়াজার দিকে ফিরিয়া আসিবে। তারপর সেই পাথরের দিকে গমন করিবে, যাহার উপর খানায়ে কাবার পয়নালা রক্ষিত। তেজী ও শক্তির সহিত ছোট ছোট পা ফেলিয়া অগ্রসর হইতে থাকিবে। রোকনে ইয়ামনীর নিকট পৌছিয়া হাতদ্বারা স্পর্শ করিবে। উহাতে চুম্বন করিবে না। এইভাবে হাজরে আসোয়াদ পর্যন্ত আসিবে। এই পুরা তাওয়াফকে এক চক্কর গণ্য করিবে। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বারও এইরূপে চক্কর লাগাইবে এবং প্রত্যেক তাওয়াফের মধ্যে নিম্নোক্ত দোয়াটি পড়িবেঃ
اللهُمَّ اجْعَلْهُ حَجَّا مَبْرُورًا وَسَعْبًا مَّشْكُورًا وَذَنْبًا مَغْفُورًا*
অতঃপর ধীরে ধীরে চলিয়া বাকী চারি তাওয়াফ পুরা করিবে। এই চারি তাওয়াফে নিম্নোক্ত দোয়া পাঠ করিবেঃ
رَبِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ وَاعْفُ عَمَّا تَعْلَمُ وَأَنْتَ الْأَعَزُّ الْأَكْرَمُ – اللَّهُمَّ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْآَنَا الَخَيَا حَيةً حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ *
তাওয়াফে কুদুমের নিয়ত করিবার কালে পার্থিব যাবতীয় নাপাক বিষয় ও বস্তু হইতে দেহ ও মনকে সম্পূর্ণরূপে পাক ও পবিত্র করিয়া লইতে হয়। হযরত রাসুলে কারীম (দঃ) বলেন, খানায় কাবার তাওয়াফও নামায ব্যতীত আর কিছু নয়। তফাৎ কেবল এতটুকু যে, তাওয়াফের মধ্যে কথা বলার অনুমতি আছে আর নামাযের মধ্যে অনুমতি নাই।
তাওয়াফের পরে করণীয়: তাওয়াফ হইতে অবসর নিয়া মাকামে ইব্রাহীমের পিছনে পৌছিয়া
সংক্ষিপ্ত দুই রাকয়াত নামায পড়িবে। প্রথম রাকয়াতে সূরা ফাতিহার সাথে সূরা কাফিরুন এবং দ্বিতীয় রাকয়াতে সূরা ইখলাস পাঠ করিবে। তারপর ফিরিয়া হাজরে আছওয়াদ স্পর্শ করতঃ দরজা দিয়া বাহির হইয়া ছাফা পাহাড়ের দিকে চলিয়া যাইবে এবং উহার উপরে এমন স্থানে আরোহণ করিবে যে খানায় কাবা দৃষ্টি গোচর হইতে থাকে। এইখানে উঠিয়া তিনবার আল্লাহু আকবার বলিয়া নিম্নোক্ত দোয়া পাঠ করিবেঃ
الْحَمْدُ لِلَّهِ عَلَى مَا هَدَانَا لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ صَدَقَ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ الْزَبَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَحْدَهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَلَا نَعْبُدُ إِلَّا إِيَّاهُ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ *
অতঃপর উক্ত পাহাড় হইতে নামিয়া আসিয়া ধীরে ধীরে মারওয়া পাহাড়ের নিকট চলিয়া যাইবে এবং উক্ত পাহাড়ে উঠিয়া এখানেও ছাফা পাহাড়ের আমলসমূহ করিবে। তারপর তথা হইতে নামিয়া আসিয়া উল্লিখিত পাহাড়দ্বয়ের মধ্যে সাতবার সায়ী সায়ী (দৌ (দৌড়ান) করিবে করিবে। প্রথম দৌড় ছাফা হইতে শুরু করিয়া মারওয়ায় শেষ করিবে। স্মরণ রাখিবে, তাওয়াফে কা’বার সময় যেমন পবিত্রতার প্রয়োজন, ছাফা মারওয়ায় সায়ীর সময়ও তেমনি পবিত্রতার প্রয়োজন।
তাওয়াফ এবং সায়ী কাজ দুইটি শেষ করার পর যদি হজ্বে তামাকু’র নিয়তকারী হয়, তবে নিজের মাথা মুণ্ডাইয়া ফেলিবে অথবা চুল কর্তন করিবে। তবে এজন্য শর্ত হইল, যদি কোরবানীর জানোয়ার সঙ্গে না থাকে। মাথা মুন্ডন অথবা চুল কর্তনের পর ইহরামকারীগণ গায়রে মোহরেম ব্যক্তির মত যে কোন কাজই করিতে পারে। আটই জিলহজ্ব তারিখ মক্কা হইতে হজ্জ্বের জন্য ইহরাম বাঁধিয়া মিনায় আসিবে। জোহর, আছর, মাগরিব এবং এশার নামায সেখানে আদায় করিবে এবং সেখানেই রাত কাটাইবে। পরবর্তী দিনের ফজরের নামাযও সেখানে পড়িবে। সূর্য উদয় হইবার পর কাফেলার সাথে অন্যান্য লোকসহ রওয়ানা হইয়া সেই জায়গায় পৌঁছিবে-আরাফার দিন লোকগণ যেখানে দাঁড়াইয়া থাকে।
সূর্য পশ্চিমে গড়াইবার পর তথায় ইমাম খুৎবাহ প্রদান করিবেন। খুৎবাহর ভিতরে তিনি লোকদিগকে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ বাতাইয়া দিবেন। যথাঃ অকুফের হুকুম, অকুফের সময়, অকুফের স্থান, আরাফাত হইতে যাত্রাকরণ, মোজদালেফায় নামায আদায় এবং রাত্রি যাপন, কঙ্কর নিক্ষেপ, কোরবানী করণ, মস্তক মুণ্ডন এবং খানায়ে কা’বার তাওয়াফ ইত্যাদি। ইমামের খুৎবাহর পরে তাহার সাথে জোহর ও আছরের নামায একত্রে মিলাইয়া পড়িবে। অবশ্য প্রত্যেক নামাযের একামত ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বলিতে হইবে। নামাযের বাদে ইমামের নিকটবর্তী হইয়া জাবালে রহমত ও ছাখরাত নামক পাথরদ্বয়ের দিকে অগ্রসর হইবে এবং কিবলার দিকে মুখ করিয়া আল্লাহ পাকের খুব বেশী মাত্রায় ছানা প্রশংসা করিবে। এ সময় নিম্নোক্ত দোয়াটি পাঠ করিবে। ছানা
لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِي وَيُمِيتُ بَهُوَ حَى لَا يَمَيْدِيْدِيْوَ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْ قَدِيرٌ -اللَّهُمَّ اجْعَلْ فِي قَلْبِى نُورًا وَ فِي بَصَرِي نُورًا وَفِي سَمْعِي نُورًا ويَسْرْ لِي أَمْرِي *
যদি ঐদিন সূর্যাস্তের পূর্বে ইমামের সাথে খাড়া হইতে না পারে (অর্থাৎ অকুফে আরাফা করিতে না পারে, তবে আগামী দিনকার ছোবহে ছাদেক আসিবার পূর্বে ইমামের সাথে শামিল হইয়া যাইবে। ইহাতেই অকুফে আরাফার হুকুম আদায় হইয়া যাইবে কিন্তু যদি ঐ সময়েল মধ্যেও ইমামের কাছে পৌছিতে না পারে, তবে হজ্ব বাতিল হইয়া যাইবে। মোজদালেফার দিকে যাইবার কালে ইমামের
সাথে খুব ধীরে-সুস্থে গমন করিবে। মোজদালেফায় পৌঁছিয়া ইমামের সহিত মাগরিব ও এশার নামায জামাতের সহিত আদায় করিবে। নিজের সামানাদি তথায়ই রাখিয়া দিবে ও সেখানেই রাত্রি যাপন করিবে। পথিমধ্য হইতে সত্তরটি প্রস্তরখণ্ড সঙ্গে লইবে। প্রস্তর খণ্ডগুলি ছোলা বুট হইতে বড় ও বাদাম হইতে ছোট হওয়া চাই। এইগুলি ধুইয়া পরিষ্কার করিয়া লওয়া মুস্তাহাব।
প্রত্যুষে মাশআরে হারামের কাছে গিয়া বেশ কিছুক্ষণ ধরিয়া আল্লাহর ছানা-প্রশংসা, তাহলীল-তাকবীর এবং দোয়া ইত্যাদি করিবে। এই সময় নিম্নোক্ত দোয়াটি পাঠ করিবেঃ
اللهُمَّ كَمَا أَوْقَفْتَنَا فِيهِ فَأَرَيْتَنَا إِيَّاهُ فَوَقَفْتَنَا لِذِكْرِكَ كَمَا هَدَيْتَنَا كَمَا هَدَيْتَنَا وَاغْفِرْ لَنَاْمَاْمَاْمَا وَاغْفِرْ لَنَا وَعَدْتَنَا بِقَوْلِكَ وَقَوْلُكَ الْحَقُّ فَإِذَا أَفَضْتُم مِنْ عَرَفَاتِ فَاذْكُرُوا اللهَ عِنْدَ الْمَشْعَرِ الْحَرَامِ – وَاذْكُرُوهُ كَمَا هَذَا كُمْ وَإِنْ كُنْتُمْ مِنْ قَبْلِهِ لَمِنَ مِنَ الضَّالِّينَ ثُمَّ أَفِيْنَ مِنَ الضَّالِّينَ أَفَاضَ النَّاسُ وَاسْتَغْفِرُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ *
সূর্য বেশ উপরে উঠিবার পর মিনায় প্রত্যাবর্তন করিবে। মিনায় পৌঁছিয়া জামরায় আকাবাতে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করিবে। প্রত্যেকটি কঙ্কর নিক্ষেপ করিবার কালে তাকবীর বলিবে এবং উভয় হাতকে এতখানি উত্তোলন করিবে যে, বগলের সাদা অংশটি যেন প্রকাশ পাইয়া যায়। যেহেতু হযরত রাসূলে কারীম (দঃ) এই ভাবেই প্রস্তর নিক্ষেপ করিতেন। এই প্রস্তর নিক্ষেপ করা চাই সূর্যোদয়ের পরে এবং সূর্য অধিক ঢলিয়া পড়ার পূর্বে। অবশ্য আইয়্যামে তাশরীকের বাকী দিন সমূহে সূর্য ঢলিয়া পড়ার পর নিক্ষেপ করিতে হইবে। প্রস্তর নিক্ষেপের পর যদি সঙ্গে কোরবানীর জানোয়ার থাকে তবে তাহা যবেহ করিবে। মাথা মুণ্ডন কিংবা চুল কর্তন করিবে। আর যদি স্ত্রীলোক হয়, তবে তাহার চুল মুণ্ডন করিতে হইবে না। ইহার পরে মক্কা চলিয়া যাইবে এবং গোসল অথবা অজু করতঃ খানায়ে কা’বার তাওয়াফে জিয়ারাত করিবে। (উল্লেখ্য যে, তাওয়াফে জিয়ারত করার নিয়ত করা জরুরী) তাওয়াফের পরে মাকামে ইব্রাহীমের নীচে দুই রাকাত নামায আদায় করিবে। ইহার পরে ইচ্ছা হইলে ছাফা মারওয়া পাহাড়ে সায়ী করিতে পারে, নতুবা তাওয়াফে কুদুমের কালে যে সায়ী করা হইয়াছে, তাহাই যথেষ্ট হইবে। এখন সেই সকল কাজ যাহা ইহরামের কারণে নিষিদ্ধ ছিল, তাহা সমস্তই জায়েয হইয়া যাইবে। অতঃপর জমজম কূপের নিকট গিয়া উহার পানি পান করিবে করিবে। পানি পান কালে নিম্নোক্ত দোয়াটি পাঠ করিবে।
بسمِ اللهِ اللَّهُمَّ اجْعَلْهُ لَنَا عِلْمًا نَافِعًا وَرِزْقًا وَاسِعًا وَرَيًّا وَشِبْعًا وَشِفَاء امِّنْ كُلِّ دَاء وَاغْسِلْهُلْهُم بَشِفَاء بَشِبْعًا وَشِفَاء قَامِنْ كُلِّ دَاء وَاغْسِلْهُ مِنْ خَشْيَتِكَ *
জমজমের নিকট হইতে আবার মিনায় প্রত্যাবর্তন করিবে এবং তথায় তিন রাত অবস্থান করিবে এবং আইয়্যামে তাশরীকে তিনটি জামবার উপরেই পূর্বোল্লিখিত নিয়মে কঙ্কর নিক্ষেপ করিবে। প্রত্যেকদিন একেক জামরার উপরে সাত সাতটি করিয়া তিনটির উপর মোট একুশটি কঙ্কর নিক্ষেপ করিবে। জামরায় উলা হইতে শুরু করিবে। ইহা মক্কা হইতে দোসরা জামরা অপেক্ষা অনেক দূরে মসজিদে খাইফের নিকটে। প্রথমে কিবলা-রোখ হইয়া উক্ত জামরার উপর কঙ্কর নিক্ষেপ করিবে। নিক্ষেপ করিবার কালে জামরায় উলা বাম দিকে থাকা চাই। এখানে কঙ্কর নিক্ষেপ করতঃ কিছুদূর সামনে অগ্রসর হইয়া পুনরায় গতিরোধ করিবে এবং এখানে এতক্ষণ অবস্থান করতঃ দোয়া কালাম পড়িবে, কোরআনে পাকের সূরা বাকারা পড়িতে যতক্ষণ লাগে। অতঃপর মধ্যম জামরার নিকট পৌঁছিয়া উহার বামদিকে দাঁড়াইয়া কিবলা রোখ হইয়া কঙ্কর নিক্ষেপ করিবে। তারপর জামরায় আকাবার কাছে পৌঁছিয়া উহার বাম দিকে দাঁড়াইয়া কিবলারোখ হইয়া কঙ্কর নিক্ষেপ করিবে। তারপর অদিতে অবতরণ করিবে, কিন্তু অবস্থান করিবে না। কিন্তু তাড়াতাড়ি ফারেগ হইতে চাহিলে
ততীয় দিন আর কঙ্কর নিক্ষেপ করিবে না বরং সঙ্গে যে কঙ্করগুলি থাকিবে তাহা মাটির মধ্যে দাফন করিয়া রাখিবে। অতঃপর তথা হইতে মক্কার দিকে রওয়ানা করিবে। অদিয়ে আবত্বাহে পৌঁছিয়া জোহর-আছর-মাগরিব ও এশার নামায আদায় করিবে। এখানে অল্প সময়ের জন্য আরাম করিবে। তারপর মক্কায় প্রবেশ করিবে।
খানায়ে কাবায় প্রবেশ কালে খালি পায়ে প্রবেশ করিবে। ভিতরে প্রবেশ করতঃ নফল নামায আদায় করিবে, শান্ত-সুস্থভাবে তৃপ্তিমত আবে জমজম পান করিবে। পান করিবার কালে আল্লাহর দরবার হইতে এলেম বৃদ্ধি, গুনাহ মাফী এবং রেজায়ে এলাহী প্রভৃতি হাসিলের নিয়ত করিবে। হুযুরে পাক (দঃ) এরশাদ করিয়াছেনঃ যে কাজের জন্য আবে জমজম পান করা হয়, উহা সেই কাজেরই জন্য বটে। এ সময় মনের খেয়াল ও চোখের দৃষ্টি করাও ইবাদত। খানায় কাবাকে লক্ষ্য করতঃ আলবিদা বলা ছাড়া তথা হইতে বাহির হইবে না। খানায় কা’বার তাওয়াফে বেদা’র নিয়ম হইল, সাতবার তাওয়াফ করিয়া রোকনে ইয়ামনী ও খানায়ে কাবার দরজার মধ্যস্থলে দণ্ডায়মান হইয়া নিম্নোক্ত দোয়াটি পড়িবেঃ
“আল্লাহুম্মা হাযা বাইতুকা অ আনা আবদুকা অবনু আবদিকা অবনু আমাতিকা হামালতানী আলা মা সাখখারতা লী মিন খালক্কিকা অসাইয়্যাতানী ফী বিলাদিকা হাত্তা বাল্লাগতানী বিনি’মাতিকা অ আ-আনতানী আলা কাজায়ি নুসুকী ফাইন কুনতা রাদ্বীতা আন্নী ফাযদিদ আন্নী রিদ্বায়ান অ ইল্লা ফামনুন আলাইয়্যাল আনা কাবলা তাবাউদী আমবাইতিকা হাযা অনছুরনী ইন আযিনাত লী গাইরা মুসতাবদিলিম বিকা অলা বাইতিকা অলা রাগিবা আনকা অলা আমবাইতিকা। আল্লাহুম্মা ফাছরাহনিয়াল আফিয়াতা ফী বাদানী অছ-ছিহাতা ফী জিসমী অল আছমাতা ফী দ্বীনী অ আহসিন মুনক্বালাবী অরযুকুনী ত্বোয়াতাকা মা আলক্বাইতানী অজমা’ লী খাইরাদ্দুনইয়া অল আখিরাতা ইন্নাকা আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর।
এই দোয়া পাঠ করিবার পর হুযুরে পাক (দঃ) এর উপর দরূদ বখশিষ করিবে। অতঃপর মক্কা হইতে রওয়ানা করিবে। আর যদি মক্কায় অবস্থান করে, তবে একটি ভেড়া জবেহ করিবে।
আরো পড়ুন:কুরআন সুন্নাহ এর দৃষ্টিতে নবী ওলীগণের শাফায়াত
ওমরাহ
ওমরাহর ছুরত হইল, গোসল করতঃ খোশবু লাগাইবে এবং শরয়ী মিকাত হইতে ইহরাম বাঁধিবে। অতঃপর মক্কা পৌছিয়া খানায়ে কাবা সাতবার তাওয়াফ করিবে। ছাফা মারওয়া পাহাড়ে সায়ী করিবে। সায়ী করিবার পর মস্তক মুণ্ডন অথবা চুল কর্তন করিবে। আর যদি কোরবানীর পশু সাথে না আনে, তবে ইহরাম খুলিয়া ফেলিবে। যদি ওমরাহকারী মক্কা মোয়াযযমায় অবস্থানকারী হয়, তবে তানঈম গিয়া সেখান হইতে ইহরাম বাঁধিয়া আসিবে এবং উপরোল্লিখিত কাজগুলি যথানিয়মে আদায় করিবে।
হজ্জ্ব ও ওমরাহর মধ্যে সহবাসের হুকুম: হজ্ব ও ওমরাহর মধ্যে স্বামী-স্ত্রী সহবাস করা বা অন্য পন্থায় এমন কিছু করা, যাহাতে বীর্যপাত ঘটে, তবে হজ্ব ও ওমরাহ বাতিল ও নষ্ট হইয়া যায়।
হজ্জ্বের আরকান (ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত)
হজ্জ্বের আরকানঃ হজ্জ্বের আরকান চারিটি; যথাঃ (১) ইহরাম বাঁধা (২) অকুফে আরাফা (৩) তাওয়াফে জিয়ারাত (৪) ছাফা ও মারওয়া সায়ী করা। যদি কোন ব্যক্তি উক্ত আরকানসমূহের মধ্যে কোন একটি রোকন ছাড়িয়া দেয়, তাহার হজ্ব আদায় হইবে না। কোন প্রকার প্রতিকার দ্বারাও উহা পূরণ হয় না; বরং এমতাবস্থায় উহার পর বৎসর বা অন্য কোন বৎসর পুনরায় ইহরাম বাঁধিয়া হজ্ব করা ওয়াজিব হইয়া যায়।
হজ্জ্বের ওয়াজিব হজ্জ্বের ওয়াজিব পাঁচটি; যথাঃ (১) মোজদালেফায় অর্দ্ধ রাত্রি পর্যন্ত অবস্থান করা (২) এক রাত্রি মিনায় অবস্থান করা (৩) কঙ্কর নিক্ষেপ করা (৪) মস্তক মুণ্ডন করা (৫) বিদায়ী তাওয়াফ করা। যদি উহার মধ্য হইতে কোন একটি ছুটিয়া যায়, তবে তাহার বদলে একটি বকরী কোরবানী করিবে। ইহা দ্বারা ওয়াজিব তরকের এইভাবে পরিপূরণ হইয়া যায়, যেভাবে নামাযের একটি ওয়াজিব তরকের জন্য সোহ-সিজদাহর দ্বারা উক্ত নামাযের পরিপূরণ হইয়া যায়।
হজ্জ্বের সুন্নত: হজ্জ্বের সুন্নত পনেরটি; যথাঃ (১) ইহরাম বাঁধিবার জন্য, মক্কায় প্রবেশের জন্য, আরাফাতে অবস্থানের জন্য, তাওয়াফে জিয়ারাত ও বিদায়ী তাওয়াফের জন্য গোসল করা (২) তাওয়াফে কুদুম করা (৩) ছাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সায়ী করা (৪) তাওয়াফ এবং সায়ী করিবার কালে সিনা উঁচু করিয়া চলা, (৫) তাওয়াফ ও সায়ী করিবার কালে কাঁধে চাদর পরিধান করা (৬) উভয় রোকনকে হাত দ্বারা স্পর্শ করা (৭) ছাফা ও মারওয়া পাহাড়ে আরোহণ করা (৯) মিনায় তিন রাত্রি অবস্থান করা (১০) মাশআরে হারামের নিকটে দণ্ডায়মান হওয়া (১১) তিনটি জামরার কাছে দণ্ডায়মান হওয়া (১২) খুৎবাহর কালে দাঁড়াইয়া অবস্থান করা (১৩) দৌড়াইবার স্থানসমূহে দৌড়ান (১৪) ধীরে ধীরে চলিবার স্থানসমূহে ধীরে ধীরে চলা (১৫) তাওয়াফের পরে দুই রাকয়াত নামায পড়া। উল্লিখিত সুন্নতসমূহের মধ্যে কোন একটি সুন্নত তরক হইয়া গেলে তাহার বদলে কোরবানী করা জরুরী নয়। অবশ্য ইহার দ্বারা হজ্জ্বের ফজীলত কমিয়া যায়।
ওমরাহর আরকান: (ফরজ) তিনটি; যথাঃ (১) ইহরাম বাঁধা (২) খানায়ে কাবার তাওয়াফ করা (৩) ছাফা এবং মারওয়ার মধ্যে সায়ী করা।
ওমরাহর ওয়াজিব: ওমরায় মাত্র একটি ওয়াজিব; যথাঃ মস্তক মুণ্ডন করা।
ওমরাহর সুন্নত: ওমরাহর সুন্নত এইগুলি; যথাঃ (১) ইহরামের সময় গোসল করা (২) তাওয়াফ এবং সায়ী করিবার কালে উহার দোয়াসমূহ পাঠ করা, ইহার সুন্নতসমূহ তরকের হুকুম হজ্বে সুন্নতসমূহ তরকেরই অনুরূপ।
মদীনা মোনাওয়্যারার জিয়ারাত
আল্লাহ পাকের একান্ত কৃপা ও অনুগ্রহে যাহার পবিত্র মদীনায় উপস্থিতি নছীব হয়, তাহার জন্য মুস্তাহাব এই যে, নিম্নোক্ত দরূদ শরীফ পাঠ করিয়া মসজিদে নবুবীতে প্রবেশ করিবে। اللهُمَّ صَلِّ عَلَى سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وَافْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ وَكُفَّ عَنِّي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ * মসজিদে নবুবীতে প্রবেশের পর হুযুরে পাক (দঃ) এর রওজা মোবারকে হাজির হইবে। তথায় পৌছিয়া মিম্বর শরীফের নিকট এইভাবে দণ্ডায়মান হইবে যে, মিম্বর শরীফ বাম দিকে থাকে। মাযার শরীফ সমুখে থাকিবে এবং কিবলার দিকের দেওয়াল পিঠের পিছনে থাকিবে। অতঃপর জিয়ারাতে
* সালাম পেশ করা * السَّلَامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ
এইভাবে সালাম প্রদান করিয়া জিয়ারাতের জন্য নির্দ্ধারিত দোয়া পাঠ করিবে। দোয়া পাঠ করিবার পর ডান দিক দিয়া কিছুটা সম্মুখে যাইয়া আর একটি দোয়া পাঠ করিবে। এই দোয়া পাঠের পর দুই রাকাত নফল নামায পড়িয়া বসিয়া যাইবে। রওজা মোবারকের মধ্যেই পবিত্র মাজার শরীফ এবং মিম্বর শরীফের মধ্যস্থলে বসিয়া নামায আদায় করা মুস্তহাব।
কোবার মসজিদে নফল নামায পড়াও মুস্তাহাব বৈ কি! শোহাদায়ে কেরামদের মাজার শরীফও জিয়ারাত করিতে পারে। তথায় দাঁড়াইয়া অত্যধিক পরিমাণে দোয়া প্রার্থনা করা উত্তম।
মদীনা মোনাওয়্যারা হইতে বিদায় হইবার কালে মসজিদে নবুবীতে একবার হাজিরা দিবে। তারপর রওজা পাকের দিকে অগ্রসর হইয়া পূর্বোল্লিখিত সালাম কালাম করিবে। সালাম কালামের পর হুযুরে পাক (দঃ)কে খেতাব করিয়া বিদায়ের এজাযত প্রার্থনা করিবে। এ সময় হুযুরে পাক (দঃ) এর পার্শ্বে
শব সম্মানিত সাহাবায়ে কেরামদ্বয়কেও সালাম করিবে। অতঃপর নিম্নোক্ত প্রার্থনাটি পাঠ করব। اللهم لا تَجْعَلُ آخِرَ الْعَهْدِ مِنِّي بِزِيَارَةِ نَبِيِّكَ وَإِذَا تَوَفَّيْتَنِي فَتَوَفَّنِي عَلَى مُحَبَّتِهِ وَسَيَهِ مُحَبَّتِهِ وَسِينَ أَرْحَمَ الرَّحِمِينَ *










