ঢাকা ০৯:২৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তাদের সংখ্যা এত বেশি হবে যে পৃথিবীর পানি পর্যন্ত তারা পান করে শেষ করে ফেলবে

ইয়াজুজ-মাজুজ : কোরআন ও হাদিসের আলোকে শেষ যুগের ভয়ংকর জাতি

শেখ আলহাজ্ব উদ্দিন
  • আপডেট সময় : ১১:৪৯:৪৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ২৪৮৮ বার পড়া হয়েছে
Sufibad.com - সূফিবাদ.কম অনলাইনের সর্বশেষ লেখা পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

কিয়ামতের পূর্ববর্তী মহা আলামতসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো ইয়াজুজ ও মাজুজ (يأجوج ومأجوج)। তারা এমন এক ধ্বংসাত্মক জাতি, যাদের আবির্ভাব পৃথিবীতে ব্যাপক অরাজকতা, রক্তপাত ও ধ্বংস ডেকে আনবে। কোরআন ও হাদিসে তাদের সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও ভীতিকর বর্ণনা পাওয়া যায়।

 

ইয়াজুজ-মাজুজ নামের অর্থ

ইয়াজুজ ও মাজুজ শব্দ দুটি এসেছে “أجّ” ধাতু থেকে, যার অর্থ—

দ্রুত ছড়িয়ে পড়া, আগুনের মতো জ্বলে ওঠা, সীমাহীন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা।

 

কোরআনে ইয়াজুজ-মাজুজের উল্লেখ

১. যুলকারনাইনের প্রাচীর ও ইয়াজুজ-মাজুজ

আল্লাহ তাআলা বলেন—

“তারা বলল, হে যুলকারনাইন! ইয়াজুজ ও মাজুজ এ দেশে ভীষণ বিপর্যয় সৃষ্টি করছে।”

📖 সূরা কাহফ: ৯৪

 

যুলকারনাইন তখন তাদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে এক সুদৃঢ় প্রাচীর নির্মাণ করেন।

“এটা আমার প্রতিপালকের রহমত। অতঃপর যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি আসবে, তখন তিনি এটিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন।”

📖 সূরা কাহফ: ৯৬

অর্থাৎ, কিয়ামতের পূর্বে এই প্রাচীর ভেঙে যাবে।

 

২. কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে তাদের মুক্তি

আল্লাহ বলেন—

“যখন ইয়াজুজ ও মাজুজকে মুক্ত করে দেওয়া হবে, তখন তারা প্রত্যেক উঁচু স্থান থেকে ছুটে আসবে।”

📖 সূরা আম্বিয়া: ৯৬

এ আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে—তাদের আবির্ভাব কিয়ামতের বড় আলামত।

 

হাদিসে ইয়াজুজ-মাজুজ সম্পর্কে বিস্তারিত

১. তাদের সংখ্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

“ইয়াজুজ-মাজুজ এমন এক জাতি, যারা যা পাবে সব ধ্বংস করে ফেলবে।”

📚 সহিহ মুসলিম

 

অন্য হাদিসে এসেছে—

তাদের সংখ্যা এত বেশি হবে যে পৃথিবীর পানি পর্যন্ত তারা পান করে শেষ করে ফেলবে।

 

২. তারা কীভাবে প্রাচীর ভাঙবে

হাদিসে এসেছে—

  • প্রতিদিন তারা প্রাচীর খুঁড়বে
  • সন্ধ্যায় বলবে: “কাল আবার আসবো”
  • কিন্তু একদিন বলবে: “ইনশাআল্লাহ”
  • তখনই আল্লাহ তাদের মুক্ত করে দেবেন

📚 মুসনাদ আহমদ (হাদিসের অর্থগত সারসংক্ষেপ)

 

৩. ঈসা (আ.)-এর সময়ে ইয়াজুজ-মাজুজ

দাজ্জাল ধ্বংসের পর—

ইয়াজুজ-মাজুজ বের হবে ঈসা (আ.)-এর যুগে।

📚 সহিহ মুসলিম

তাদের ভয়ে ঈসা (আ.) মুমিনদের নিয়ে পাহাড়ে আশ্রয় নেবেন।

 

ইয়াজুজ-মাজুজের ধ্বংস

মানুষ তাদের ধ্বংস করতে পারবে না। তখন—

আল্লাহ বিশেষ কীট বা পোকা পাঠাবেন,

যা তাদের ঘাড়ে আক্রমণ করে এক রাতেই সবাইকে ধ্বংস করে দেবে।

📚 সহিহ মুসলিম

 

এরপর পৃথিবীতে এমন দুর্গন্ধ ছড়াবে যে—

  • আল্লাহ পাখি পাঠাবেন
  • তারা লাশ সরিয়ে ফেলবে
  • এরপর প্রবল বৃষ্টি দিয়ে পৃথিবী পরিষ্কার করা হবে

 

ইয়াজুজ-মাজুজ থেকে আমাদের শিক্ষা

১. আল্লাহর কুদরতের প্রতি ঈমান

মানবশক্তি যত বড়ই হোক, আল্লাহর সামনে কিছুই নয়।

 

২. কিয়ামতের প্রস্তুতি

ইয়াজুজ-মাজুজের আলোচনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এই দুনিয়া চিরস্থায়ী নয়।

 

৩. দোয়া ও তাকওয়া

শেষ যুগের ফিতনা থেকে বাঁচতে আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো উপায় নেই।

 

ইয়াজুজ-মাজুজ কেবল ইতিহাস বা গল্প নয়—এটি কোরআন ও সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত এক বাস্তব সত্য। তাদের আবির্ভাব মানবজাতির জন্য এক মহাপরীক্ষা হবে। অতএব, আমাদের কর্তব্য হলো—

ঈমান মজবুত করা, কোরআন-সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা এবং আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনা করা।

“হে আল্লাহ! শেষ যুগের সকল ফিতনা থেকে আমাদের রক্ষা করুন।” আমিন।

 

আরো পড়ুন:

Sufibad 24

ব্লগটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

তাদের সংখ্যা এত বেশি হবে যে পৃথিবীর পানি পর্যন্ত তারা পান করে শেষ করে ফেলবে

ইয়াজুজ-মাজুজ : কোরআন ও হাদিসের আলোকে শেষ যুগের ভয়ংকর জাতি

আপডেট সময় : ১১:৪৯:৪৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ জানুয়ারী ২০২৬

কিয়ামতের পূর্ববর্তী মহা আলামতসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো ইয়াজুজ ও মাজুজ (يأجوج ومأجوج)। তারা এমন এক ধ্বংসাত্মক জাতি, যাদের আবির্ভাব পৃথিবীতে ব্যাপক অরাজকতা, রক্তপাত ও ধ্বংস ডেকে আনবে। কোরআন ও হাদিসে তাদের সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও ভীতিকর বর্ণনা পাওয়া যায়।

 

ইয়াজুজ-মাজুজ নামের অর্থ

ইয়াজুজ ও মাজুজ শব্দ দুটি এসেছে “أجّ” ধাতু থেকে, যার অর্থ—

দ্রুত ছড়িয়ে পড়া, আগুনের মতো জ্বলে ওঠা, সীমাহীন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা।

 

কোরআনে ইয়াজুজ-মাজুজের উল্লেখ

১. যুলকারনাইনের প্রাচীর ও ইয়াজুজ-মাজুজ

আল্লাহ তাআলা বলেন—

“তারা বলল, হে যুলকারনাইন! ইয়াজুজ ও মাজুজ এ দেশে ভীষণ বিপর্যয় সৃষ্টি করছে।”

📖 সূরা কাহফ: ৯৪

 

যুলকারনাইন তখন তাদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে এক সুদৃঢ় প্রাচীর নির্মাণ করেন।

“এটা আমার প্রতিপালকের রহমত। অতঃপর যখন আমার প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি আসবে, তখন তিনি এটিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেবেন।”

📖 সূরা কাহফ: ৯৬

অর্থাৎ, কিয়ামতের পূর্বে এই প্রাচীর ভেঙে যাবে।

 

২. কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে তাদের মুক্তি

আল্লাহ বলেন—

“যখন ইয়াজুজ ও মাজুজকে মুক্ত করে দেওয়া হবে, তখন তারা প্রত্যেক উঁচু স্থান থেকে ছুটে আসবে।”

📖 সূরা আম্বিয়া: ৯৬

এ আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে—তাদের আবির্ভাব কিয়ামতের বড় আলামত।

 

হাদিসে ইয়াজুজ-মাজুজ সম্পর্কে বিস্তারিত

১. তাদের সংখ্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

“ইয়াজুজ-মাজুজ এমন এক জাতি, যারা যা পাবে সব ধ্বংস করে ফেলবে।”

📚 সহিহ মুসলিম

 

অন্য হাদিসে এসেছে—

তাদের সংখ্যা এত বেশি হবে যে পৃথিবীর পানি পর্যন্ত তারা পান করে শেষ করে ফেলবে।

 

২. তারা কীভাবে প্রাচীর ভাঙবে

হাদিসে এসেছে—

  • প্রতিদিন তারা প্রাচীর খুঁড়বে
  • সন্ধ্যায় বলবে: “কাল আবার আসবো”
  • কিন্তু একদিন বলবে: “ইনশাআল্লাহ”
  • তখনই আল্লাহ তাদের মুক্ত করে দেবেন

📚 মুসনাদ আহমদ (হাদিসের অর্থগত সারসংক্ষেপ)

 

৩. ঈসা (আ.)-এর সময়ে ইয়াজুজ-মাজুজ

দাজ্জাল ধ্বংসের পর—

ইয়াজুজ-মাজুজ বের হবে ঈসা (আ.)-এর যুগে।

📚 সহিহ মুসলিম

তাদের ভয়ে ঈসা (আ.) মুমিনদের নিয়ে পাহাড়ে আশ্রয় নেবেন।

 

ইয়াজুজ-মাজুজের ধ্বংস

মানুষ তাদের ধ্বংস করতে পারবে না। তখন—

আল্লাহ বিশেষ কীট বা পোকা পাঠাবেন,

যা তাদের ঘাড়ে আক্রমণ করে এক রাতেই সবাইকে ধ্বংস করে দেবে।

📚 সহিহ মুসলিম

 

এরপর পৃথিবীতে এমন দুর্গন্ধ ছড়াবে যে—

  • আল্লাহ পাখি পাঠাবেন
  • তারা লাশ সরিয়ে ফেলবে
  • এরপর প্রবল বৃষ্টি দিয়ে পৃথিবী পরিষ্কার করা হবে

 

ইয়াজুজ-মাজুজ থেকে আমাদের শিক্ষা

১. আল্লাহর কুদরতের প্রতি ঈমান

মানবশক্তি যত বড়ই হোক, আল্লাহর সামনে কিছুই নয়।

 

২. কিয়ামতের প্রস্তুতি

ইয়াজুজ-মাজুজের আলোচনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এই দুনিয়া চিরস্থায়ী নয়।

 

৩. দোয়া ও তাকওয়া

শেষ যুগের ফিতনা থেকে বাঁচতে আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো উপায় নেই।

 

ইয়াজুজ-মাজুজ কেবল ইতিহাস বা গল্প নয়—এটি কোরআন ও সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত এক বাস্তব সত্য। তাদের আবির্ভাব মানবজাতির জন্য এক মহাপরীক্ষা হবে। অতএব, আমাদের কর্তব্য হলো—

ঈমান মজবুত করা, কোরআন-সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা এবং আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনা করা।

“হে আল্লাহ! শেষ যুগের সকল ফিতনা থেকে আমাদের রক্ষা করুন।” আমিন।

 

আরো পড়ুন: