কেন মুরিদ আল্লাহর কুদরতি হাত না ধরে পীরের হাত ধরলেন?
পীরের প্রতি মুরিদের মহব্বত কেমন হওয়া উচিত? – আদাবুল মুরিদ
- আপডেট সময় : ০১:২৪:২৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩ জানুয়ারী ২০২৬
- / ২৪৭৫ বার পড়া হয়েছে
আমার পীর কেবলাজান হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব “শলপ” স্টেশন হইয়া কোলকাতায় যাইতেন। আবার কোলকাতা হইতে “শলপ” স্টেশন হইয়াই দেশে আসিতেন। ঐ শলপ স্টেশন আমার পীর কেবলার পরশে ধন্য ছিল।
পীর কেবলার নির্দেশে আমাকে মাঝে মাঝে কোলকাতায় যাইতে হইত। আমিও উক্ত স্টেশন হইয়া কোলকাতায় যাইতাম। স্টেশনের নিকটবর্তী হইয়া প্রথমেই স্টেশনকে অভিনন্দন জানাইতাম, ছালাম দিতাম। বলিতাম, হে শলপ স্টেশন! তুমি জামানার শ্রেষ্ঠতম মুজাদ্দেদ খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেবের পদধুলি পাইয়া ধন্য। তাঁহার খেদমত করিতে পারিয়া তুমি গর্বিত। তোমার অবয়বে সেই আনন্দের আভাই ফুটিয়া উঠিয়াছে। তুমি এই মিছকিনের ছালাম গ্রহণ কর। অভিনন্দন নাও। কোলকাতা হইতে ফিরিবার পথে স্টেশনের নিকটবর্তী হইয়া আবার শলপ স্টেশনকে অভিবাদন জানাইতাম, ছালাম দিতাম।
নির্জীব ও অচেতন পদার্থ যে ওলী-আল্লাহদের খেদমতে অতিশয় খুশী হয় তাহার একটি দৃষ্টান্ত তুলিয়া ধরিতেছি। ওলীয়ে কামেল হযরত মোহাম্মদ মুবারক (রঃ) বলিয়াছেন যে, একদা আমি হযরত ইব্রাহিম আদহাম (রঃ) ছাহেবের সংগে বায়তুল মোকাদ্দাসের ময়দানে ছিলাম। মধ্যাহ্নিক বিশ্রামের সময় আমরা একটি আনার গাছের নীচে অবতরণ করিলাম এবং কয়েক রাকায়াত নামাজ পড়িলাম। আমি আনার গাছটি হইতে আওয়ায শুনিতে পাইলাম, হে ইব্রাহিম আদহাম! আমাকে সম্মানিত করুন এবং আমার কিছু ফল ভক্ষণ করুন। হযরত ইব্রাহিম আদহাম (রঃ) ছাহেব মস্তক সম্মুখের দিকে নত করিলেন। গাছটি তিনবার উপরোক্ত রূপ বলিল, অতঃপর আমাকে বলিল, হে আবু মোহাম্মদ! আপনি ইব্রাহিম আদহামকে একটু সুপারিশ করুন, তিনি যেন আমার ফল ভক্ষণ করেন। আমি ইব্রাহিম আদহাম (রঃ) কে বলিলাম, হে আবু ইসাহাক! আপনি কি এই গাছটির আবেদন শুনিতেছেন? তিনি বলিলেন, শুনিতেছি। এই বলিয়া তিনি দাঁড়াইলেন এবং গাছ হইতে দুইটি আনার ছিঁড়িয়া একটি আমাকে দিলেন এবং অপরটি নিজে খাইলেন। হযরত ইব্রাহিম আদহাম (রঃ) ছাহেবকে খাওয়াইতে পারিয়া গাছটিও ধন্য হইল, সম্মানিত হইল। ঠিক তেমনি “শলপ স্টেশন” আমার পীর কেবলাজানের পদধূলি বক্ষে ধারণ করিয়া সম্মানিত হইয়াছিল। তাই কোলকাতায় যাওয়া আসার সময় আমি শলপ স্টেশনের নিকটবর্তী হইতে না হইতেই দন্ডায়মান হইয়া ইহাকে ছালাম দিতাম।
কামেল পীর পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। ওলী-আল্লাহগণ বহু খোঁজাখুজির পর কামেল পীরের সন্ধান পাইয়াছেন। কিন্তু এই মিছকিনকে তাহা করিতে হয় নাই। জামানার শ্রেষ্ঠতম মুজাদ্দেদ, হযরত খাজাবাবা এনায়েতপুরী (কুঃ) ছাহেব নিজেই পালকিতে করিয়া আমাদের বাড়ীতে গমন করিয়াছিলেন আমাকে এবং আমার বড় ভাইকে আনয়নের জন্য। আমার আব্বাজানের নিকট চাওয়া মাত্রই তিনি আমাদের দুই জনকে (অর্থাৎ আমাকে এবং বড় ভাই মোঃ আলতাফ হোসেন) সানন্দে পীর কেবলার কদমে সোপর্দ করিলেন। সেই হইতেই আমার দেল পীর কেবলার প্রতি মুতাওয়াজ্জুহ ছিল। দশ বছর বয়স হইতে পীরের কদমে আমার খেদমত শুরু হয়। মাঝে মাঝে বাড়ীতে আসিতাম, কোলকাতায় যাইতাম। কিন্তু মন পড়িয়া থাকিত পীর কেবলার কদমে। কেবলাজান হুজুরকে না দেখিলে মোটেই ভাল লাগিত না।
দরবারে খেদমতরত অবস্থায় তিনি আমাকে নামে মাত্র সামান্য পরিমানে খাবার দিতেন। ফলে ক্ষুধাজনিত দুর্বলতায় আমি শুকাইয়া যাইতাম। আমার হাঁটিতেও কষ্ট হইত। কিন্তু প্রতিদিন সকালে যেইমাত্র পীর কেবলার নূরানী চেহারা মোবারক দেখিতাম, তৎক্ষণাৎ ক্ষুধার জ্বালার কথা ভুলিয়া যাইতাম।
যখন হইতে পীর কেবলাজানের খেদমত আমার নছিব হইয়াছে, তখন হইতে দুনিয়ার কোন কিছুর প্রতি মন আমার লাগিত না। সর্বক্ষণই মন-প্রাণ থাকিত পীরের দিকে। তাই পীর কেবলাজান আমাকে কবুল করিলেন। বলিলেন, “তোমার দাদা পীর (হযরত ওয়াজেদ আলী (রঃ) ছাহেব) যেমন তদীয় কদমের নীচে আমাকে জায়গা দিয়াছিলেন, আমিও তেমন তোমাকে আমার কদমের নীচে রাখিয়া দিলাম।”
এই পথে কামেল পীরই হইল প্রধান মাধ্যম। পীরের কবুলিয়ত পাইলে সংগে সংগে আল্লাহ ও রাসূলের স্বীকৃতি মিলে। এক মুহূর্তও আর বিলম্ব হয় না। হযরত মাওলানা রূমী (রঃ) ছাহেব তাই বলেন,
“চু তো যাতে পীরেরা কারদি কবুল হাম খোদা দর জাতাশ আমাদ হাম রসূল।”
অর্থাৎ-যেইমাত্র তুমি তোমার পীরের জাতকে কবুল করিলে, তখনই আল্লাহ তোমাকে বান্দা হিসাবে, রাসূল (সাঃ) তোমাকে উম্মত হিসাবে কবুল করিলেন; আল্লাহ ও রাসূল (সাঃ) এর পক্ষ হইতে তখনই তুমি স্বীকৃতি পাইলে, যখন আপন পীরের তরফ হইতে স্বীকৃতি পাইলে।
কাজেই, মূল কথাই হইল পীরের কবুলিয়ত অর্জন। সেই উদ্দেশ্যে পীরের দিকে মন-প্রাণ মুতাওয়াজ্জুহ রাখিতে হয়-যাহা শ্রেষ্ঠতম আদব।
একদা কোন কামেলের এক মুরীদ জাহাজে করিয়া কোথাও যাইতেছিলেন। অকস্মাৎ জাহাজটি দুর্ঘটনায় পড়ে। ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়িয়া জাহাজটি তলাইয়া যায়। সেই মুরীদও পানিতে তলাইয়া যাইতে থাকে। এমন সময় একটি জ্যোতির্ময় হাত তাহার দিকে আসিতে দেখে এবং অদৃশ্য হইতে আওয়াজ হয়-“তুমি এই হাত ধর। তোমাকে তীরে পৌঁছাইয়া দেওয়া হইবে।” মুরীদ জিজ্ঞাসা করিল, “ইহা কাহার হাত?” আওয়াজ হইল, “ইহা আল্লাহতায়ালার কুদরতী হাত।” মুরীদ বলিল, “আমি আল্লাহর কুদরতী হাত চিনি না। কাজেই এই হাত আমি ধরিব না।” হাত উঠিয়া গেল। তৎক্ষণাৎ আর একটি হাত তাহার দিকে প্রসারিত হইল। আওয়াজ হইল, “এই হাত ধরিলে তোমাকে তীরে উঠাইয়া দেওয়া হইবে।” মুরীদ জানিতে চাহিল, “ইহা কাহার হাত?” উত্তর হইল, “ইহা নবী করীম (সাঃ) এর হাত।” মুরীদ বলিল, “আমি কখনও নবী করীম (সাঃ) কে দেখি নাই। তাহার হাতকেও আমি চিনি না। তাই এই হাত আমি ধরিব না।” সংগে সংগে হাত উঠিয়া গেল। আর একটি হাত তাহার দিকে প্রসারিত হইল। বলা হইল, “এই হাত ধর। তোমাকে নির্ঘাত পারে উঠাইয়া দেওয়া হইবে।” মুরীদ জিজ্ঞাসা করিল, “ইহা কাহার হাত?” আওয়াজ হইল, “তাকাইয়া দেখ। ইহা তোমার পীরের হাত।” মুরীদ তাকানো মাত্রই পীরের হাতকে চিনিতে পারিয়া ধরিয়া ফেলিল। আল্লাহপাকের কৃপায় মুরীদ আসন্ন মৃত্যুর কবল হইতে রক্ষা পাইল।
হযরত মঈনুদ্দিন চিশতি (রঃ) ছাহেবের মুরীদ ছিলেন হযরত কুতুবুদ্দিন কাকী (রঃ) এবং হযরত কুতুবুদ্দিন কাকী (রঃ) এর মুরীদ ছিলেন হযরত শেখ ফরিদ (রঃ)। একদা হযরত মঈনুদ্দিন চিক্তি (রঃ) কুতুবুদ্দিন কাকী (রঃ) এর খানকায় আসিলে হযরত কাকী (রঃ) তাঁহাকে কদমবুছি করিলেন। হযরত কাকী (রঃ) এর মুরীদানেরাও তাঁহাকে কদমবুছি করিলেন। কিন্তু একমাত্র হযরত শেখ ফরিদ (রঃ) চিশতি (রঃ) কে কদমবুছি করিলেন না। তিনি বরং আপন পীর হযরত কাকীকেই (রঃ) কদমবুছি করিলেন। ইহা দৃষ্টে হযরত কুতুবুদ্দিন কাকী (রঃ) ছাহেব ফরিদকে ধমক দিয়া বলিলেন, “আমার পীর জামানার নূর। সকলেই তাঁহাকে কদমবুছি করিল। তুমি করিলে না কেন?” তৎক্ষণাৎ হযরত চিন্তি (রঃ) শেখ ফরিদের কপালে চুম্বন দিয়া কুতুবুদ্দিন কাকীকে (রঃ) উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, “হে কুতুবুদ্দিন! তোমার মুরীদানদের মধ্যে একমাত্র শেখ ফরিদই খোদাপ্রাপ্তিতত্ত্বজ্ঞানের যোগ্যতা লাভ করিয়াছে। তাঁহার লক্ষ্য কেবল পীরের দিকেই।”
কাজেই হে জাকেরান ও আশেকান সকল! তোমরা তোমাদের দেলকে সর্বদাই পীরের দিকে মুতাওয়াজ্জুহ রাখ। মনে-প্রাণে খেদমত করিতে থাক। যে দিক-নির্দেশনা দেওয়া হইল, সেই অনুযায়ী যদি চলিতে পার, তবে খোদাপ্রাপ্তিজ্ঞান অর্জন করিতে পারিবে-তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। তোমরা কামিয়াবী হও, আল্লাহপাক তোমাদিগকে দয়া করুন। দু’আ ইতি।
নসিহত শরীফ “আদাবুল মুরিদ” ১ম খন্ড ৫২,৫৩,৫৪,৫৫ পৃষ্ঠা।
আরো পড়ুন :















